মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’।
চুক্তির মূল বক্তব্য—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সামরিক হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রভাব ছিল, নতুন এই উদ্যোগ সেই নিরাপত্তা কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা বাড়ায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও সমন্বিত করার প্রয়োজন অনুভব করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
কেন এই জোট?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় একক কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ। আর তৃতীয়ত, নিজেদের কৌশলগত বিকল্প শক্তিশালী করা।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হামলার ঝুঁকিতে পড়ার বিষয়টিও এই নতুন নিরাপত্তা ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিন দেশের শক্তির জায়গাটিও আলাদা।
পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশটির রয়েছে বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা।
তুরস্ক দিতে পারে সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ড্রোনসহ আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দেশটির সামরিক অভিজ্ঞতাও এই জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব।
অর্থাৎ—পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রযুক্তি এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি—এই তিনটি উপাদান এক জায়গায় আসার সম্ভাবনাই চুক্তিটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বাস্তবে এই জোট কতটা কার্যকর হবে?
চুক্তিতে এক দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হলেও সীমিত সংঘাত, ড্রোন হামলা কিংবা সীমান্ত উত্তেজনার মতো পরিস্থিতিতে অন্য দুই দেশ ঠিক কতটা সামরিকভাবে সরাসরি জড়াবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়া তিন দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতাও ভিন্ন। পাকিস্তানকে ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। তুরস্ক একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতির অংশ। আর সৌদি আরব অর্থনৈতিক রূপান্তর ও ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তাই চুক্তি হলেও সব ধরনের সংঘাতে তিন দেশের অভিন্ন অবস্থান নিশ্চিত করা সহজ হবে না।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—এই উদ্যোগ আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনায় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভবিষ্যতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ শুধু পশ্চিমা অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে তুরস্কের প্রযুক্তি এবং পাকিস্তান-তুরস্কের যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দিকে আরও বেশি নজর দিতে পারে।
এ জোটের উদ্দেশ্য নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
সবশেষে বলা যায়, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বাস্তবে কতটা শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কোনো সংকটময় মুহূর্তে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একে অপরের পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায় তার ওপর।
তবে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন একটি শক্তির ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা যে তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
Leave a Reply