শরীয়তপুরের সদর উপজেলার উত্তর ভাষানচর গ্রামের দেলোয়ার চৌকিদার এর ছেলে মানিক চৌকদার, ২০২৫ সালে নড়িয়া উপজেলার জয়নাল ছৈয়ালের ছেলে সুজন ছৈয়ালের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ টাকা বিনিময়ে লিবিয়া যান, ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্য। এইদিকে সুজনের সাথে মানিককে লিবিয়া থেকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সুজন একাই ইতালি চলে যান।
পরে মানিক ইতালি যেতে না পেরে ২০২৬ সালের ৬ মে মাসে ইজিপ্টেয়ার, এম এস বোয়িং ৭৮৭-৯ বিমানে করে বাংলাদেশের চলে আসেন। মানিক দেশে থাকলেও মানিকের পরিবার বলছে মানিকের খোঁজ তারা জানেন না, মানিক লিবিয়াতে নিখোঁজ রয়েছেন। যদিও এলাকাবাসী বলছেন মানিককে তারা গত মে মাসে (কোরবানি ইদের সময়) এলাকায় দেখেছেন এবং স্থানীয় দরবার শালিসে উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন,
এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে মানিকের বাবা দেলোয়ার বাদী হয়ে মানিকের খোঁজ পেতে এবং মানিককে নেয়ার টাকার ফেরত পেতে গত ২৮ জুন, দুবাই প্রবাসি আমিনুল বেপারি (৩৩) এবং ইতালি প্রবাসী নুরুল হক বেপারিসহ (৩৩), ৫ জনকে আসামি করে গত ২৮ জুন মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইবুনাল শরীয়তপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।
কিন্তু মানিককে, সুজন লিবিয়াতে নিলেও তাকে আসামি করা হয়নি। এমনকি মানিককে ইতালি নেয়ার জন্য সুজন যাদের একাউন্টে টাকা নিয়েছেন, তাদেরকেও আসামি করা হয়নি। মূলত সুজন ৪ নং আসামী মাতুল খার বড় বোনের ছেলে। মূলত সুজনকে না পেয়ে, টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য সুজনকে আসামি না করে, ৫ জনকে আসামি করা হয়। তারা মানিককে লিবিয়া নেয়ার সাথে জড়িত না এমনটা দাবি করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের দাবি, বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় মূল ঘটনা আড়াল করে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিবেশী এই পরিবারের ৫জনকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
মামলার নথি ও সরেজমিনে আংগারিয়া ইউনিয়নের৭ নং ওয়ার্ডের উত্তর ভাষানচর গ্রামে গিয়ে স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, দেলোয়ার চৌকদারের ছেলে মানিক চৌকদার ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে নড়িয়া উপজেলার ‘সুজন ছৈয়াল’ নামে এক দালালের সাথে চুক্তি করেন এবং টাকা-পয়সা লেনদেন করেন। পরবর্তীতে এই সুজন ছৈয়ালই মানিককে লিবিয়ার একটি ‘গেম ঘরে’ জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে এবং বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন চালিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।এই ঘটনার পর এলাকায় বেশ কয়েকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ-দরবার অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও সেসব সালিশে দেলোয়ার চৌকদার প্রতিবেশী আমিনুল বেপারী বা তার পরিবারের কারো কাছে বিদেশ নেওয়ার নামে কোনো টাকা দিয়েছেন—এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ বা রসিদ উপস্থাপন করতে পারেননি। পুর্বশত্রুতার জেরে পরিবারটিকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এই ঘটনায় গত ৮ জুন মামলার ৩ নং আসামী এনামুল বেপারী (৪০) এবং ৪ নং আসামি মাতুল খাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেফতারের আদালত তাদেরকে কারাগারে প্রেরণ করে। স্থানীয়রা জানান, গত কোরবানির ঈদেও মানিক চৌকদারকে এলাকায় নিজের বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। কিন্তু পরিবার বলছে মানিক নিখোঁজ রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য আসামী এনামুল বেপারীর স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “একই গ্রামে বাড়ি হওয়ায় মানিক নামের ওই ছেলের বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের সাথে কোনো দিন কোনো কথাই হয়নি। মূলত প্রতিবেশী দেলোয়ার চৌকদার, তার ছেলে মানিক চৌকদার এবং বিল্লাল চৌকদার দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদার টাকা না দেওয়ায় কিছুদিন আগে তারা আমার ভাসুর এনামুল বেপারীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় মানিক চিৎকার করে বলেছিল টাকা না দিলে তোকে মেরেই ফেলবো, কেউ বাঁচাতে পারবে না। সেই পূর্ব শত্রুতা ও চাঁদা না পেয়ে আমাদের সামাজিকভাবে হেনস্তা করতে এই মিথ্যা মানব পাচার মামলা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন,
আমরা শুনছি সুজন ছৈয়াল নামে একজন মানিককে ইতালি নেয়ার জন্য টাকা নিয়েছিল। কিন্তু তাকে আসামি না করে, পূর্ব শত্রুতা জেরে আমার স্বামীসহ পাঁচজনকে আসামি করছে মানিকের বাবা। আসামি আমিনুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইমোতে প্রতিবেদকে জানান, হয়রানি করতে আমাকে মামলার আসামি করা হয়েছে। আমি কোনভাবেই মানিককে বিদেশ নেয়ার জন্য কারো সাথে কথা বলিনি বা কোন টাকাও নেই নি। অথচ মানিককে যার বিদেশ নেওয়ার কথা, বরন তাকেই তারা আসামি করেনি। আমি আদালতের কাছে দাবি জানাই যেন সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়। তাহলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগের (মামলার) বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী দেলোয়ার চৌকদার চাঁদা দাবি ও মারধরের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমার ছেলে মানিককে আমিনুলই ইতালি পাঠানোর কথা বলে নিয়ে গেছে। এখন দালাল সুজন ছৈয়াল আমার ছেলেকে লিবিয়ার গেম ঘরে আটকে রেখে বহুবার মারধর করেছে এবং টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তবে একই গ্রামের প্রতিবেশী আমিনুল বেপারীর সাথে সুজন ছৈয়ালের কী সম্পর্ক বা কীভাবে লেনদেন হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারেননি।
সুজন আপনার ছেলেকে নিয়ে থাকলে তাকে কেন মামলার আসামি করেননি। জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাকে প্রশ্ন করা হয় আপনার ছেলে এখন কোথায় রয়েছে, তিনি জানান আমার ছেলে বিদেশ থেকে আর ফিরে আসেনি। তাকে জানানো হয় স্থানীয়রা দাবি করছেন আপনার ছেলে দেশে রয়েছে, গত কোরবানি ঈদে আপনার ছেলেকে স্থানীয়রা আপনার বাড়িতে দেখেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন। আমার ছেলে দেশে আসেননি। সে কোথায় আছে আমরা জানিনা।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন বলেন, মামলাটি আদালতে চলমান রয়েছে। আদালতে পিটিশন করা হয়েছে। মামলার অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আরো ২ জন আসামি বিদেশে পলাতক করেছেন। তারা নিয়মিত মানব পাচারের সাথে যুক্ত। বাদী পক্ষের দাবি, শীঘ্রই যেন অন্যান্য আসামিদের জন্য গ্রেফতার করা হয়। এই বিষয়ে জানতে চাইলে আসামীর পক্ষের আইনজীবী মোস্তফা কামাল রনি বলেন, আসামীর পক্ষে প্রতি যে অভিযোগ আনা হয়েছে ইহা অসত্য। আমরা আদালতের প্রতি আস্থাশীল এবং ন্যায়পরায়ন আদালত নিশ্চয়ই সঠিক বিচার করবেন।
Leave a Reply