প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেকের সভা চলছে। বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে শুরু হয় গুরুত্বপূর্ণ এ সভা।
সভায় দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প—এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটি কার্যতালিকায় রাখা হয়েছে। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ঢাকার দুই অংশকে যুক্ত করতে নেওয়া এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
তবে শেষ মুহূর্তে প্রকল্পটির অনুমোদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, এমআরটি লাইন-৫-এর প্রায় সব প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে যাওয়ায় এটিকে একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট উইং এ নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রেজেন্টেশনও তৈরি করেছে। তবে শেষ মুহূর্তে সরকার প্রকল্পটি অনুমোদনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
এর আগে অন্য একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশের অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় থাকা দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানা গেছে।
এদিকে এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছে। ফলে প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাবতলী থেকে শুরু হয়ে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কাওরান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দিতে যাবে এই মেট্রোরেল।
পুরো ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে প্রায় ২৮ মিনিট। ব্যস্ত সময়ে প্রতি ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পরপর ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, পুরো রুটের মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়ালপথ। থাকবে মোট ১৫টি স্টেশন। এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন।
প্রকল্পে শুরুতে ছয়টি কোচের ১৯টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবেন।
ডিএমটিসিএলের হিসাবে, মেট্রোরেলটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুটে চলাচল করতে পারবেন।
প্রকল্পটির ব্যয় নিয়েও এসেছে বড় পরিবর্তন। পতিত সরকারের সময়ে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরে পর্যালোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে সর্বশেষ প্রস্তাবে তা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
অর্থাৎ আগের হিসাবের তুলনায় ব্যয় কমেছে প্রায় ৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
তবে এই কমানো ব্যয়ের পুরোটা প্রকৃত সাশ্রয় নয়। কারণ বিদেশি ঋণের সুদ ও কমিটমেন্ট চার্জের মতো কিছু দায় প্রকল্প ব্যয় থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগকে পরিশোধ করতে হবে।
এছাড়া জমি অধিগ্রহণ, যানবাহন, পরামর্শক, সম্মানি ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে ব্যয় কমানো হয়েছে।
প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণও কমানো হয়েছে। শুরুতে ২৩ দশমিক ০৯ হেক্টর জমির প্রয়োজন ধরা হলেও বর্তমানে প্রয়োজন হবে ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর। এতে জমি অধিগ্রহণ ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে পুনর্বাসন খাতে রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা।
প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ঋণের অর্থায়নে থাকবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল—ইডিসিএফ। এডিবি সর্বোচ্চ ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে এসব ঋণ ছাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত।
ইতোমধ্যে এডিবির কারিগরি সহায়তায় প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মৌলিক ও বিস্তারিত নকশা, দরপত্রে সহায়তা এবং জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনার কাজ শেষ হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহামদ বলেছেন, ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেলের বিকল্প নেই। তবে সব রুট পর্যায়ক্রমে চালু হলেই এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।
এখন মূল নজর একনেকের সিদ্ধান্তের দিকে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে অর্থায়ন চুক্তি, জমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার নিয়োগসহ পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর অনুমোদন না হলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অর্থাৎ ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্পের পরবর্তী পথ নির্ধারিত হতে পারে আজকের একনেক সভার সিদ্ধান্তে।
Leave a Reply