জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, নতুন কমিটির একটি খসড়া ইতোমধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে রয়েছে। তার চূড়ান্ত অনুমোদনের পর যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে নতুন কমিটির।
তবে কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ফলে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা জোরালো হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
নতুন কমিটি নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতের পর বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বিদায়ী বার্তা দেন।
দলীয় সূত্র বলছে, ওই বৈঠকে সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা, সংগঠনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আনার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নেতাদের মূল দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
তারেক রহমান বিদায়ী নেতাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং নতুনদের সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এরই মধ্যে ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি দেওয়া হয়।
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ দুই বছর। সে হিসেবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন নেতৃত্বের জন্য পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা বাড়তে থাকে।
নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান।
এ ছাড়া কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিক, রিয়াদ রহমান, আরিফুল ইসলাম আরিফ, খোরশেদ আলম সোহেল, তরিকুল ইসলাম তারিক, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, শরীফ প্রধান শুভ, মোস্তাফিজুর রহমান শুভ, সাফি ইসলাম ও নুর আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কারা শীর্ষ দুই পদে আসছেন, তা নির্ভর করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।
সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল বলেছেন, নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে। হাইকমান্ড যে কাঠামোকেই উপযুক্ত মনে করবে, সেটির প্রতি সবাই আস্থাশীল থাকবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে রিয়াদ রহমান মনে করেন, ভবিষ্যতের ছাত্র নেতৃত্বকে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
মমিনুল ইসলাম জিসানও জানিয়েছেন, সহযোদ্ধাদের একটি অংশ তাকে নেতৃত্বে দেখতে চায়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের—এবং সেই সিদ্ধান্তের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে নানা প্রত্যাশা রয়েছে। তাদের কেউ চাইছেন, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হোক। আবার কেউ মনে করছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদলকে শুধু রাজপথের আন্দোলনকেন্দ্রিক সংগঠন না রেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণে আরও সক্রিয় হতে হবে।
বিশেষ করে নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া, সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলো নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এদিকে বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিদায়ী বার্তায় দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, দায়িত্ব থেকে বিদায় নিলেও ছাত্রদল থেকে বিদায় নিচ্ছেন না।
সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও একইভাবে বিদায়ী বার্তায় বলেছেন, পদ থেকে বিদায় নেওয়া গেলেও আদর্শ ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া যায় না। নতুন নেতৃত্বের অধীনে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী ও গতিশীল হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সবমিলিয়ে রাকিব-নাছির নেতৃত্বের পর এবার ছাত্রদলের হাল কারা ধরছেন—এ প্রশ্নেই এখন সংগঠনের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সম্ভাব্য নাম নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো নামই চূড়ান্ত নয়।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের পরই প্রকাশ পাবে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। আর সেই কমিটিই ঠিক করবে আগামী দিনে ছাত্রদলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক গতিপথ।
Leave a Reply