1. admin@channelgbangla.com : admin :
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ অপরাহ্ন

তিস্তা, ব্রিকস ও প্রতিরক্ষা—ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন দিগন্ত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
  • ৮ বার পঠিত

বাংলাদেশ ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে ঘোষণা দিয়েছে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সরকারি চীন সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণাপত্রে উঠে এসেছে কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, তিস্তা প্রকল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্রিকস, এসসিও এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছেছে ঢাকা ও বেইজিং। বিস্তারিত জানাচ্ছেন স্টাফ রিপোর্টার।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সরকারি সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নিউ চ্যাম্পিয়ন্স ২০২৬ বা সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেন। পরে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক আস্থা, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব এবং বাস্তবমুখী সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। দুই দেশই মনে করে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

চীন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে এবং নতুন সরকারের শাসন কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ বিফোর অল’ নীতির প্রশংসাও করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দুই দেশ বিদ্যমান ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্ব’কে আরও উন্নীত করে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে, যাতে দুই দেশের জনগণ আরও বেশি উপকৃত হয়।

যৌথ ঘোষণাপত্রে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাই করবে দুই দেশ।

বাংলাদেশ আবারও ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীতে একটিই চীন, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিংই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে এবং জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণে চীনের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ বেছে নেওয়ার অধিকারের প্রতিও সম্মান জানিয়েছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই-এর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়নেও সহযোগিতা করবে।

শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষির সহনশীলতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, ই-কমার্স, সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেও যৌথভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ ও চীন।

বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

যৌথভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যৌথ ঘোষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তিস্তা নদী। সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও গভীর করবে দুই দেশ। চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহায়তা করবে এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা করবে।

প্রতিরক্ষা খাতেও সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা হবে।

এছাড়া গণমাধ্যম, শিক্ষা, গবেষণা, থিংক ট্যাংক, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, ক্রীড়া, যুব উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে চীন। জনস্বাস্থ্য এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা খাতেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে চীন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে বেইজিং। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা এসসিওতে অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন দিয়েছে চীন।

যৌথ ঘোষণায় দুই দেশ জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এবং বিশ্ব শান্তির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

রাখাইন সংকটে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছে চীন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে দেশটি।

এই সফরে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2026
Design By Raytahost