সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তবে এজাহারভুক্ত আরও ছয় আসামি এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডের পুরো নেপথ্য এখনো তদন্তাধীন।
অটোরিকশা রাখা নিয়ে স্থানীয় বিরোধের জেরে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকায় ঘটনার সূত্রপাত বলে পুলিশ ও র্যাবের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে। একপর্যায়ে ওই বিরোধে জড়িয়ে পড়েন এসআই আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আরিফুল ইসলাম। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে আলতাফ হোসেন নিজের পুলিশ পরিচয় দেন। কিন্তু র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ পরিচয় জানার পরও হামলাকারীরা পিছু হটেনি।
বরং আলতাফ হোসেনকে ধাওয়া করে তার ছেলে আরিফুলের পোশাক কারখানা পর্যন্ত নিয়ে যায়। সেখানে গেট ভেঙে প্রবেশ করে তাকে ও তার ছেলেকে মারধর করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। কারখানার মেশিন ও আসবাবপত্র ভাঙচুরের অভিযোগও রয়েছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক এসআই আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে আরিফুল ইসলামও গুরুতর আহত হন।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই অভিযান শুরু করে পুলিশ, ডিবি ও র্যাব। প্রথমে মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আমিনবাজার, সাভার ও মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- জহিরুল ইসলাম (৩২), আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০), ইমরান (২৬), নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪), রাকিব মিয়া (২৮), ছাব্বির আহম্মেদ (২৪) ও ওয়াসিম (৪০)।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারদের একজনের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় তিনটি মাদক মামলা রয়েছে।
নিহত এসআই আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিউলি বেগম বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। ফলে এজাহারভুক্ত আরও ছয়জন এখনো গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছেন।
মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ। সোমবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা সিদ্দিকার আদালত শুনানি শেষে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের আশা, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল, কারা অন্যদের ঘটনাস্থলে ডেকেছিল এবং কারা দ্বিতীয় দফায় পোশাক কারখানায় হামলা চালানোর সঙ্গে জড়িত- এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো- আলতাফ হোসেন নিজের পুলিশ পরিচয় দেওয়ার পরও কেন হামলাকারীরা থামেনি?
প্রাথমিক বিরোধ যদি অটোরিকশা রাখা নিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে সেই বিরোধ কীভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ধাওয়া করে তার ছেলের কারখানায় গিয়ে দ্বিতীয় দফা হামলা পর্যন্ত গড়াল- এখন সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কারখানায় হামলার সময় কারা নেতৃত্ব দিয়েছে, কারা নতুন করে লোকজন জড়ো করেছে এবং কার কার আঘাতে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, কোনো বিরোধের জেরে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে একজন পুলিশ সদস্য নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও যদি তাকে প্রকাশ্যে হামলা করে হত্যা করা হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
সচেতন মহলের মতে, এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে দ্রুত গ্রেপ্তার করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় পুলিশের ওপর হামলার বিচার দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা ও মনোবলহীনতা তৈরি হতে পারে।
তবে তাদের মতে, দ্রুত বিচার মানে তড়িঘড়ি করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং প্রত্যেক আসামির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা তদন্ত করে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে উপস্থাপন করা।
এসআই আলতাফ হোসেন হত্যায় ৯ জন গ্রেপ্তার এবং প্রধান আসামির রিমান্ড তদন্তে অগ্রগতি হলেও এখানেই শেষ নয়। অটোরিকশা নিয়ে সামান্য বিরোধ কীভাবে এত বড় সহিংসতায় রূপ নিল, কারা হামলায় নেতৃত্ব দিল এবং দ্বিতীয় দফায় কারখানায় হামলার পেছনে কারা ছিল- এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ ছাড়াই দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদঘাটন করা। একই সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এতে নিহত পুলিশ কর্মকর্তার পরিবার যেমন বিচার পাবে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও আস্থা ও মনোবল অটুট থাকবে।
Leave a Reply