বাংলার একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ— “কই মাছের প্রাণ”। কারণ, বাজার থেকে জীবন্ত কই মাছ কেনার ঘণ্টাখানেক পরও দেখা যায়, সেটি এখনো নড়াচড়া করছে। অনেক সময় থলে থেকে লাফিয়ে বেরিয়েও আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অন্য মাছ যেখানে পানি ছাড়া দ্রুত মারা যায়, সেখানে কই মাছ কীভাবে এতক্ষণ বেঁচে থাকে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে কই মাছের শরীরের এক বিশেষ অঙ্গের মধ্যে। সাধারণ মাছ শুধু ফুলকার মাধ্যমে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণ করে। পানি থেকে তুলে ফেললে ফুলকার সূক্ষ্ম তন্তুগুলো শুকিয়ে যায় এবং একে অপরের সঙ্গে লেগে যায়। ফলে বাতাসে অক্সিজেন থাকলেও মাছ সেটি গ্রহণ করতে পারে না। এ কারণেই বেশিরভাগ মাছ দ্রুত মারা যায়।
কিন্তু কই মাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। এদের ফুলকার পাশাপাশি থাকে একটি বিশেষ অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র, যার নাম ল্যাবিরিন্থ অঙ্গ। এই অঙ্গ বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে সক্ষম। ফলে পানি কম থাকলেও কিংবা ডাঙায় উঠে এলেও কই মাছ দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীরা জানান, কই মাছ মুখ দিয়ে বাতাস গ্রহণ করে এবং সেই বাতাস ল্যাবিরিন্থ অঙ্গে পৌঁছে। সেখানে থাকা অসংখ্য রক্তনালি বাতাস থেকে অক্সিজেন শোষণ করে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেয়। এ কারণেই ভেজা পরিবেশে বা স্যাঁতসেঁতে থলের ভেতরে কই মাছ ঘণ্টার পর ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে।
তবে এই ক্ষমতারও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ল্যাবিরিন্থ অঙ্গ কার্যকর রাখতে আর্দ্রতা প্রয়োজন। যদি মাছের শরীর পুরোপুরি শুকিয়ে যায়, তাহলে এই অঙ্গও কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত মাছটি মারা যায়।
শুধু তাই নয়, কই মাছের রয়েছে আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। বর্ষাকাল বা জলাশয় শুকিয়ে গেলে তারা বুকের পাখনা ও শরীরের নড়াচড়ার সাহায্যে মাটির ওপর দিয়ে এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে চলে যেতে পারে। এই অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতাই কই মাছকে অন্য অনেক মাছের তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই কই মাছকে নিয়ে বাংলায় “কই মাছের প্রাণ” প্রবাদটির জন্ম হয়েছে। বাস্তবেও এই মাছের বেঁচে থাকার ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর।
Leave a Reply