ঢাকার সাভারে ল্যাবজোন প্রাইভেট হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানোর চেষ্টা করতে গিয়ে প্রসব না করিয়েই রোগীর পেট সেলাই করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসক শাহানা ফেরদৌসী ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রোকসানা বেগম ও তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম।
ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী সাভার মডেল থানায় মামলা করেছেন। একই সঙ্গে সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রোকসানা বেগমের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, গত ১৫ মে গর্ভের সন্তান প্রসবের জন্য তার স্ত্রীকে সাভারের ল্যাবজোন প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুপুর ১২টার দিকে তাকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) পাঠানো হয়।
জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগ, দুপুর ১টার দিকে চিকিৎসক শাহানা ফেরদৌসী তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার শুরু করেন। একপর্যায়ে তার স্ত্রীর তলপেট কেটে ফেলা হলেও সেখান থেকে সন্তান বের করা হয়নি। বরং চিকিৎসক তাদের জানান, রোগীকে বাঁচানো সম্ভব নয় এবং দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। এরপর পেটের কাটা অংশ কোনোভাবে সেলাই করে রক্তক্ষরণরত অবস্থায় রোকসানা বেগমকে ঢাকায় পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় রোকসানা বেগমের প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। গুরুতর অবস্থায় সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর দুই দিন পর কর্তব্যরত চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করান। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই অসুস্থ বলে দাবি পরিবারের।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনার পর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে তারা আর্থিকভাবে চরম সংকটে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসক শাহানা ফেরদৌসী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মামলা না করার জন্য তাদের বলা হয় এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে গত ২৬ আগস্ট হাসপাতাল মালিকপক্ষ ক্ষতিপূরণ হিসেবে মাত্র ১০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাদের সঙ্গে অসদাচরণ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে ল্যাবজোন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াকিলুর রহমান বলেন, রোকসানা বেগম চিকিৎসাসেবা নিতে হাসপাতালে এলে চিকিৎসক শাহানা ফেরদৌসী তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য ওটিতে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, অপারেশন চলাকালে রোগীর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয় যে পাঁচ থেকে ছয় ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। পরিবারের পক্ষ থেকে রক্তের ব্যবস্থা করতে অপারগতা জানানো হলে চিকিৎসক তাদের জানান, দ্রুত রক্ত দেওয়া সম্ভব না হলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের খরচে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ওয়াকিলুর রহমান আরও দাবি করেন, রোগীকে স্থানান্তরের আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং রোকসানা বেগমের চিকিৎসাসংক্রান্ত হিস্ট্রি লিখিতভাবে তাদের কাছে পাঠানো হয়। রোগীর সুবিধার্থে হাসপাতালের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতাও করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে, ঘটনাটিকে শুধু চিকিৎসকের বক্তব্য বা রোগীর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, চিকিৎসা-প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফজলে বারী বলেন, বিষয়টি আমরা আমলে নিয়েছি। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোগীকে যথাযথ আইন ও চিকিৎসা প্রটোকল মেনে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অপারেশন থিয়েটারে পাঠানো হয়েছিল কি না, সেটিসহ অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি জানান, আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a Reply