মাছ কাটার পর মেঝেতে পড়ে থাকা রুপালি আঁশ অনেকের কাছে নিছক বর্জ্য। কিন্তু রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন মাছের বাজারে এই ফেলে দেওয়া আঁশই হয়ে উঠেছে বহু মানুষের জীবিকার অবলম্বন।
মাছ কাটার পর আঁশ সংগ্রহ, ধোয়া, শুকানো ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত আছেন অনেক শ্রমজীবী মানুষ। তাদের হাত ঘুরে এসব আঁশ পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এমনকি রপ্তানি হয় বিদেশেও।
তবে এই খাতে কাজ করা মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আঁশের দাম কমে যাওয়া। সংগ্রহকারীদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় শুকনা মাছের আঁশ কেজিপ্রতি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ টাকায়।
কারওয়ান বাজারের আঁশ সংগ্রহকারী মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে তিনি মাছ কাটা ও আঁশ সংগ্রহের কাজ করছেন। আগে দিনে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হলেও এখন কোনো কোনো দিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি আয় হয় না।
তার ভাষ্য, ভেজা আঁশ ধুয়ে শুকিয়ে বিক্রির উপযোগী করতে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হয়। বৃষ্টি হলে শুকাতে দেওয়া আঁশ দ্রুত সরিয়ে নিতে হয়, আবার রোদ উঠলে নতুন করে শুকাতে দিতে হয়।
শুধু জাকির নন, সালমা বেগম ও শাহেদা বেগমের মতো অনেক নারীও মাছ কাটার পর পাওয়া আঁশ সংগ্রহ করে ধুয়ে শুকিয়ে বিক্রি করছেন। তাদের মাসিক আয় খুব বেশি না হলেও সংসারের খরচ মেটাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাছের আঁশের ব্যবহারও বিস্তৃত। এটি থেকে কোলাজেন ও জিলেটিন তৈরি হয়, যা ওষুধ শিল্পে ক্যাপসুলের খোসা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া প্রসাধনী, কৃত্রিম হাড়, কৃত্রিম কর্নিয়া, গয়না এবং মাছ ও পোলট্রি খাদ্য তৈরিতেও মাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশ সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ থেকে মাছের আঁশ রপ্তানি করা হয়।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ হাজার ৬৯৯ টন মাছের আঁশ রপ্তানি হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ মার্কিন ডলার।
তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ ও আয় দুটোই কমেছে। ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কম দাম—সব মিলিয়ে মাছের আঁশ সংগ্রহকারীদের জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
যে আঁশকে আমরা প্রতিদিন বর্জ্য হিসেবে ফেলে দিই, সেটিই যে মূল্যবান কাঁচামাল এবং বহু মানুষের জীবিকার উৎস—এই বাস্তবতাই সামনে এনেছে মাছের আঁশের ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি।
Leave a Reply