২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নামেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা। আর বিদায়ী ম্যাচেই গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে দলকে এনে দেন ৩-০ গোলের জয়।
৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে আয়োজিত এই ম্যাচটি ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের শেষ অধ্যায়। ক্রীড়া প্রতিবেদনে দেখুন বিস্তারিত।
ম্যাচ শুরুর আগেই আবেগঘন হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। জাতীয় সংগীতের সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেসি। তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন তিনি। গ্যালারি থেকে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনিও তাকে শুভেচ্ছা জানান। মাঠে প্রদর্শন করা হয় মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি, যেখানে লেখা ছিল ‘Gracias’—অর্থাৎ ধন্যবাদ।
ম্যাচের দশম মিনিটে মেসির ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে খেলা থামিয়ে দেওয়া হয়। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালিতে অভিবাদন জানায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে।
প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মেসির কর্নার থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন নিকোলাস ওটামেন্দি। এরপর নিকো পাজকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন মেসি। আর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজেই গোল করে বিদায়ী ম্যাচকে পূর্ণতা দেন তিনি। এটি ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল।
শেষ বাঁশির পর মেসিকে ঘিরে ধরেন সতীর্থরা। শুরু হয় ড্রোন শো। আকাশে ফুটে ওঠে তার ছবি ও ক্যারিয়ারের নানা স্মৃতি। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে পাওয়া সাফল্যের জন্য মেসিকে শ্রদ্ধা জানায় আর্জেন্টিনা।
বিদায়ী বক্তব্যে মেসি বলেন, ২০ বছরেরও বেশি সময় আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে পারা তার জন্য বিশাল গর্বের বিষয়। জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে না নামার বিষয়টি কষ্টের বলেও জানান তিনি। তবে অনেক কিছু ভেবে এটিই সঠিক সময় বলে মনে করছেন বলে জানান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ হলো ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল নিয়ে। তিনিই আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোলদাতা। জাতীয় দলের হয়ে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০২২ বিশ্বকাপ জয়। এর আগে ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকাও জিতেছেন তিনি।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসি একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন।
বিদায়ী ম্যাচের আগে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় মেসিকে সম্মানসূচক ডক্টরেটও প্রদান করে। সাবেক সতীর্থ নেইমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসিকে শ্রদ্ধা জানান।
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবলে আপাতত মেসিকে দেখা যাবে। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তার চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ রাতটি তাই শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়—শেষ হলো একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়। মাঠ ছাড়ার সময় অশ্রুসিক্ত মেসিকে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাল হাজারো সমর্থক। আর পুরো ফুটবল বিশ্ব জানিয়ে দিল—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বরের এই অধ্যায় ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
Leave a Reply