একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
বর্তমানে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র প্রায় অর্ধেক পরিবারই কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারের দেওয়া সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করা, বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করা এবং এর সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
এতে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছানো আরও সহজ হবে।
সংস্থাটি এ ক্ষেত্রে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। এর মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থেমে গেছে এবং বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
তবে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্যও দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি করছে। খেলাপি ঋণের হারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণও দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর ফলে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও উন্নয়নমূলক খাতে সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতার কথাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। শক্তিশালী প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধির কারণে এ খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসম বলেছেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের বার্তাটি হলো—দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সেই সহায়তা যেন সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আর এ জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও নিখুঁত করার পাশাপাশি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও দ্রুত সংস্কার করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
Leave a Reply