বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তা আছে, কিন্তু সেই রাস্তা যেন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিনের দুর্ভোগের কারণ। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার আলাওলপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ৮৫ নম্বর পেদাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র সংযোগ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা। মূল সড়ক থেকে বিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মিটার রাস্তা সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা-পানিতে পরিণত হয়। এতে বিদ্যালয়ের ১৩০ জন শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেককেই জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। কেউ পিছলে পড়ে যায়, কারও পোশাক কাদায় নষ্ট হয়, আবার কারও বই-খাতাও ভিজে বা নোংরা হয়ে যায়। পরিস্থিতি খারাপ হলে কেউ কেউ বিদ্যালয়ে না গিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়। ফলে শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগ নয়, এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পড়াশোনাতেও।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়ের মূল সড়কটি ভাঙাচোরা হলেও সেটি পাকা। ফলে মূল সড়ক পর্যন্ত কোনোভাবে পৌঁছানো সম্ভব হলেও বিপত্তি শুরু হয় সেখান থেকে বিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ার সংযোগ সড়কে। প্রায় ৩০০ মিটার বা ৯০০ ফুট এই পথটুকু পুরোপুরি কাঁচা হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে রাস্তার বিভিন্ন অংশে তৈরি হয় কাদা। ছোট ছোট শিশুদের জন্য তখন এই পথ পাড়ি দেওয়াই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা আঞ্জুমান মুক্তা বলেন, বিদ্যালয়টি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরের পর থেকেই সংযোগ সড়কটি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রতিবছরই একই চিত্র দেখে আসছেন।
তিনি বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা সম্ভব হয় না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জুতা খুলে হাতে নিয়ে কাদার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে ছোট শিক্ষার্থীরা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, রাস্তার কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের মাঠটিও নিচু হওয়ায় বৃষ্টির সময় সেখানে পানি জমে যায়।
সমস্যাটির সমাধানে তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছেন বলেও জানান। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। এরপর উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদেও আবেদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি।
তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার করা এখন জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি অনতিবিলম্বে রাস্তার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাইনুদ্দিন মিয়া বলেন, আগে বিদ্যালয়টি মূল সড়কের পাশে থাকায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে এমন সমস্যা ছিল না। বিদ্যালয়টি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার পর মূল সড়ক থেকে বিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত কাঁচা পথটিই বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, কাদার মধ্যে দিয়ে আসতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী বই-ব্যাগসহ পড়ে যায়। কারও পোশাক নষ্ট হলে বা বই-খাতা কাদায় ভিজে গেলে তারা আর বিদ্যালয়ে থাকতে পারে না। বিশেষ করে বর্ষার সময় কয়েক মাস শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে তাদের শেখার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, রাস্তা কাদা হয়ে গেলে জুতা পরে হাঁটতে গেলে পা পিছলে যায়। তাই জুতা হাতে নিয়ে স্কুলে আসতে হয়। অনেক সময় পড়ে গিয়ে জামা-কাপড় নোংরা হয়ে যায়। তখন বাড়িতে ফিরে যেতে হয়।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, বৃষ্টির দিনে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে তাদেরও চিন্তায় থাকতে হয়। কাদা-পানির কারণে শিশুরা স্কুলে যেতে চায় না, অনেক সময় কান্নাকাটিও করে। তখন অভিভাবকদের নিজেরাই সন্তানদের নিয়ে কষ্ট করে বিদ্যালয়ে আসতে হয়।
তিনি বলেন, রাস্তাটি দ্রুত ঠিক করা গেলে শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো সহজ হবে এবং তাদের পড়াশোনারও সুবিধা হবে। এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাকিল আহমেদ বলেন, মূল সড়ক থেকে বিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ার সংযোগ সড়কটি কাঁচা হওয়ায় বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। কাদার কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের পোশাকও নোংরা হয়ে যায়।
তবে রাস্তার কাজ শিক্ষা অফিসের আওতাধীন নয় জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের সড়কের কাজ উপজেলা এলজিইডি অফিসের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে।
এদিকে সমস্যাটির বিষয়ে গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে তাঁর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইউএনও ছুটিতে রয়েছেন। পরে মুঠোফোনে তাঁকে দুইবার হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এরপর প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে বিদ্যালয়ের কাঁচা সংযোগ সড়ক, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও এর সমাধানের বিষয়ে জানতে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তিনি বার্তাটি দেখলেও প্রতিবেদন তৈরি পর্যন্ত কোনো উত্তর দেননি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমস্যাটি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগ চলছে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৩০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও তাদের বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর শেষ ৩০০ মিটার পথ এখনো নিরাপদ ও চলাচল উপযোগী হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, সাময়িকভাবে মাটি বা বালু ফেলে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার পরিবর্তে এবার প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। মূল সড়ক থেকে বিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি পাকা করা হলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি বাড়বে, অভিভাবকদের উদ্বেগ কমবে এবং পাঠদানের পরিবেশও স্বাভাবিক হবে।
শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগের চিত্র সামনে আসার পর এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পরস্পরের ওপর দায় চাপিয়ে না রেখে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেবে। কারণ একটি বিদ্যালয়ের ১৩০ জন শিশুর নিরাপদ যাতায়াত
Leave a Reply