কাকডাকা ভোর। হাতে বই নিয়ে কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মস্থলে ছুটে চলা মানুষ, অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নেওয়ার তাড়া—সবাই এক জায়গায় এসে থামে কীর্তিনাশা নদীর পাড়ে। অপেক্ষা শুরু হয় একটি ট্রলারের জন্য। ট্রলার এলে হুড়োহুড়ি করে ওঠেন যাত্রীরা। বর্ষার দিনে বৃষ্টি আর উত্তাল স্রোত উপেক্ষা করেই নদী পার হতে হয়। এভাবেই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ।
একসময় এই নদীর ওপর ছিল ভাষাসৈনিক গোলাম মাওলা সেতু। সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ আজ এক দশকের অপেক্ষার গল্পে পরিণত হয়েছে। সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ায় মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালে নির্মিত ১০৫ মিটার দীর্ঘ পুরোনো সেতুটি ২০১৫ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সেতুর কাজ শুরু হলেও প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস কাজ করে চলে যায়। পরে দ্বিতীয় দফায় নতুন নকশায় সেতুর সঙ্গে ২২২ মিটার ভায়াডাক্ট যুক্ত করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ঠিকাদারও অর্ধেক কাজ শেষ করে নির্মাণ বন্ধ করে দেয়। এ পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এখন তৃতীয় দফায় নতুন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে আগের অভিজ্ঞতায় স্থানীয়দের মনে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
পুরোনো সেতু ভেঙে ফেলার পর ২০২৩ সাল থেকে নদীতে তিনটি ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী ও মোটরসাইকেল পারাপার চলছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে সেই যাত্রা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নড়িয়া থেকে জাজিরা হয়ে ঢাকায় যাওয়ার প্রধান সড়কের মাঝেই রয়েছে এই সেতু। পদ্মা সেতু চালুর পর এই পথে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেতু না থাকায় কোনো যানবাহন নদী পার হতে পারে না। যারা ট্রলারে উঠতে চান না, তাদের প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ ঘুরে জেলা শহরের প্রেমতলা হয়ে পদ্মা সেতুর পথে যেতে হয়।
শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন ঠিকাদারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুটি চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের একটাই প্রশ্ন—এই অপেক্ষার শেষ কবে? দশ বছর ধরে প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে তারা এখন শুধু একটি নিরাপদ সেতুর অপেক্ষায়।
Leave a Reply