ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব ও ওয়ারিশ সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ, সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ এবং সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ উঠেছে, ইউনিয়ন পরিষদে সচিব, গ্রাম পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্বে থাকলেও স্থানীয় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে সেবা গ্রহণে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে। সোমবার দুপুরে সরেজমিনে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের কাগজপত্র হাতে নিয়ে যাচাই-বাছাই করছেন কয়েকজন যুবক। সচিবের কক্ষের সামনে ও ভেতরে থাকা সেবা প্রত্যাশীদের বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করে তাদের সঙ্গে আলাপ করতে দেখা যায় ওই যুবকদের।
আরও পড়ুন,
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিজেকে ছাত্রদল কর্মী পরিচয় দিয়ে জনি নামের এক যুবক বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আমাদের ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদকে ইউনিয়ন পরিষদটি দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা শামীম আহমেদের পক্ষ থেকে সেবা নিতে আসা মানুষকে সহযোগিতা করছি। তবে সেবা প্রত্যাশীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তাদের অভিযোগ, এসব যুবক নিজেদের সুবিধার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ অগ্রাধিকার দিয়ে করিয়ে দেন। ফলে অন্যদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, পরিষদে আসা ব্যক্তিদের সমস্যার কথা শুনে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়, আর টাকা না দিলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফি কমিয়ে দেওয়ার নামে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় শাপলা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা শাহিদা বেগম জানান, ভোটার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র নিতে তিনি ইউনিয়ন পরিষদে এসেছিলেন। সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তার কাজ হয়নি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কয়েকজন যুবক আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন, ২০ হাজার টাকা দিলে দ্রুত প্রত্যয়নপত্রসহ সব কাজ করে দেবেন। আমার পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। পরে দুই হাজার টাকা দিতে চাইলেও তারা রাজি হননি।
একই ধরনের অভিযোগ করেন মেইটকা গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সনদ নিতে এসে নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করা হয়েছে। টাকা দিতে না পারায় তার কাজ আটকে আছে। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের জানালে তারাও টাকা হলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা জানান।
আরও পড়ুন,
অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা কারও কাছ থেকে টাকা নিয়েছি- এমন অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। বরং আগে যারা দালালি করে টাকা নিয়ে সেবা দিত, তাদের আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বের করে দিয়েছি।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে ইউনিয়ন পরিষদে বহিরাগতদের অবস্থান নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ করছেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. আনিছুর রহমান বলেন, এখন থেকে আমিই সবকিছু দেখবো। যাতে সেবা প্রত্যাশীদের কোনো ভোগান্তি না হয় এবং বহিরাগতরা কোনো ধরনের খবরদারি করতে না পারে, সেজন্য আগামীকাল থেকেই সব কার্যক্রম আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
Leave a Reply