আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৫:২৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাত: হরমুজ প্রণালীতে জোড়া জাহাজ হামলায় ধ্বংস, উত্তপ্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজার

মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাত: হরমুজ প্রণালীতে জোড়া জাহাজ হামলায় ধ্বংস, উত্তপ্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজার

যেদিন সাগরের ঢেউয়ে ছাই আর বারুদের গন্ধ ছড়ায়, সেদিন বুঝে নিতে হয়—পৃথিবীর বুক থেকে শান্তির দিনগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম সামরিক উত্তেজনার পারদ এখন বিশ্ববাণিজ্যের প্রধানতম সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালী’কে ঘিরে। জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা বা আইএমও (IMO) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক জরুরি বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, হরমুজ প্রণালীতে একের পর এক হামলায় সম্প্রতি মোট তিনটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে।

​আইএমও-র প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, প্রথমত, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সাগরের বুকে তলিয়ে গেছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’ (GFS PRIDE)। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, জাহাজটিতে থাকা ২১ জন নাবিককেই অক্ষত ও নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং তারা সবাই সুস্থ রয়েছেন। দ্বিতীয়ত, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ ‘কেপ দাও’ (Cape Dao)-এ প্রজেক্টাইল আঘাত হানে।

জাহাজটির বডি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিকদের সময়োপযোগী পদক্ষেপে এটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করতে সক্ষম হয়। এছাড়া, পূর্বে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতবিক্ষত হওয়া মাল্টার পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার নামক আরও একটি বাণিজ্যিক জাহাজ সাগরের পানিতে পুরোপুরি তলিয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছে আইএমও।

​এসব হামলার পেছনে নিজেদের সামরিক শাখা আইআরজিসি (IRGC)-র ভূমিকা ও অবস্থানের কথা জানিয়ে তেহরান বলেছে, নির্ধারিত নিরাপত্তা শর্ত ও অনুমতি না মেনে অননুমোদিত রুট ব্যবহার করার কারণেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান সংঘাত বা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় না; তবে তাদের দেওয়া যৌক্তিক শর্তসমূহ পূরণ না হলে এই প্রতিরোধ কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তারা নতুন করে সংঘাত বাড়াতে না চাইলেও ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের নিরাপত্তার ওপর আঘাত এলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, বরং উপযুক্ত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

​হরমুজ প্রণালীর এই অস্থিরতা ও আইএমও-র জরুরি সতর্কবার্তার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে তীব্র মন্দা ও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিত্যদিনের জীবনের ওপর পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ তাদের প্রয়োজনীয় তেলের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যের এই নৌপথ ব্যবহার করে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় তেলের ট্যাংকার ও এলএনজিবাহী জাহাজ সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোল, ডিজেল ও এলএনজি গ্যাসের তীব্র সংকটের সাথে সাথে তেলের দাম বৃদ্ধির বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জাহাজের ভাড়া ও বিমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

​যুদ্ধের দামামা আর ক্ষমতার লড়াইয়ে পুরো বিশ্ব আজ এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবমান। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আর কত রক্তপাত ও ধ্বংসের পর শেষ হবে এই মহাবিপদ? বিশ্ব রাজনীতির এই কঠিন হিসাব-নিকাশের খেসারত দিতে থাকা সাধারণ মানুষ আর ঠিক কতদিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে, নাকি সংঘাতের এই বিষাক্ত কালো ধোঁয়া গিলে খাবে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে?

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন