দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত নির্মিত দুই লেনের দুটি সার্ভিস সেতু। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে আশুলিয়ার ধউর এলাকায় ফিতা কেটে সেতু দুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। উদ্বোধনের পরপরই সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তবে সেতু দুটিতে চলাচলের জন্য কোনো টোল দিতে হবে না।
তুরাগ নদের ওপর নির্মিত প্রতিটি সার্ভিস সেতুর দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ১৭ কিলোমিটার। একটি সেতু দিয়ে ধউর থেকে আশুলিয়ার দিকে এবং অন্যটি দিয়ে আশুলিয়া থেকে ধউরের দিকে যান চলাচল করবে। সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি পথচারী, সাইকেল ও অটোরিকশাও সেতু দুটি ব্যবহার করতে পারবে।
সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেতু দুটি চালুর ফলে ধউর-আশুলিয়া সড়কে দীর্ঘদিনের যানজট ও যাতায়াতের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তুরাগ নদের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত হবে।
সেতু উদ্বোধন শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও যানজটমুক্ত হবে। তিনি বলেন, শুধু উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করাই নয়, ঢাকার উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাকেও এলিভেটেড পথের মাধ্যমে আরও নির্বিঘ্ন করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে নগরীর অ্যাটগ্রেড সড়কের ওপর চাপও কমবে।
প্রকল্পটি একসময় স্থবির হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি কাজ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। মন্ত্রী জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের আরও একটি বড় অংশ চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে মূল প্রকল্পের কাজ প্রায় সমাপ্তির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আজ চালু হওয়া সার্ভিস সেতু দুটি পুরোপুরি টোলমুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতেও এসব সড়কে কোনো টোল নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, একটি সেতু দিয়ে ধউর থেকে আশুলিয়ার দিকে এবং অন্যটি দিয়ে আশুলিয়া থেকে ধউরের দিকে যান চলাচল করবে। পথচারী, সাইকেল ও অটোরিকশাসহ সাধারণ যানবাহনও এসব সেতু ব্যবহার করতে পারবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, তুরাগ নদের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে আশুলিয়া বাজার থেকে ধউর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কটি আর রাখা হচ্ছে না। এর পরিবর্তে নতুন সার্ভিস লেন ও সেতুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে তুরাগ নদ পারাপারে সাধারণ যানবাহনকে কোনো টোল দিতে হবে না। দীর্ঘদিনের যানজট ও সড়ক ভোগান্তির পর সার্ভিস সেতু দুটি চালু হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা।
পিকআপ চালক মুমিনুল ইসলাম বলেন, আগে এই সড়কে দীর্ঘ যানজটের কারণে পণ্য পরিবহন ও চলাচলে অনেক সময় নষ্ট হতো। সার্ভিস সেতু চালু হওয়ায় যানজট অনেকটাই কমবে বলে আশা করছি। এতে দ্রুত ও নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। নতুন সেতু চালু হওয়ায় আমাদের মতো চালকদের জন্য এটি বড় স্বস্তির বিষয়। আশুলিয়ার বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আশুলিয়ার সড়কে তীব্র যানজট ও ভোগান্তি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। নতুন সেতু চালু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত অনেক সহজ হবে। এখন থেকে যানজটের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছি।
স্থানীয় পথচারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উত্তরা থেকে আশুলিয়ায় আসতে আগে প্রায়ই দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হতো। সার্ভিস সেতু চালু হওয়ায় এখন যাতায়াত আরও দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে বলে আশা করছি। এটি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ আশুলিয়া হয়ে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর।
প্রকল্পের আওতায় ২৪ কিলোমিটার উড়ালপথের পাশাপাশি প্রায় ১১ কিলোমিটার র্যাম্প, নবীনগরে দুই লেনের ফ্লাইওভার, বাইপাইলে ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ, ১৪ কিলোমিটার অ্যাটগ্রেড সড়ক পুনর্নির্মাণ, সেতু, ওভারপাস ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। থাকছে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ইউটিলিটি ডাক্ট ও টোল প্লাজা। প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৭২ শতাংশ। পুরো প্রকল্প চালু হলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের যানজট কমানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও কর্মজীবী মানুষের যাতায়াতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ধউর-আশুলিয়া অংশের দুই সার্ভিস সেতু চালুর মধ্য দিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত এই মেগা প্রকল্পের সুফল পাওয়ার প্রাথমিক ধাপ শুরু হলো। এখন বাকি কাজ দ্রুত শেষ করে পুরো এক্সপ্রেসওয়ে চালুর অপেক্ষায় আশুলিয়া-সাভারবাসী।
Leave a Reply