সরকারি বীজ উৎপাদন ও সংগ্রহ কার্যক্রমে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এক ডেপুটি ডিরেক্টর বা ডিডির বিরুদ্ধে। বীজের গুণগত মান উপেক্ষা করে নিম্নমানের বীজ সংগ্রহ, শ্রমিকদের বেতন আত্মসাৎ, কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বীজ আদায় এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কৃষক ও শ্রমিকরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডিডির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানসম্মত বীজ সংগ্রহ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে তিনি ভালো মানের বীজ থাকা সত্ত্বেও রং খারাপ, গজানো এবং একাধিক জাত মিশ্রিত নিম্নমানের বীজ সংগ্রহ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যক্তিগত সুবিধা বা ঘুষের বিনিময়ে এসব নিম্নমানের বীজ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চুক্তিভিত্তিক বীজ উৎপাদনকারী কৃষকরা, অন্যদিকে ভবিষ্যতে কৃষকদের কাছে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, ডিডির নির্দেশে সংস্থার গাড়ি বরাদ্দসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধাও দেওয়া হয় শুধুমাত্র যাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া সম্ভব হয়। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে টাকা কিংবা বিভিন্ন উপহার দিয়ে নিজের উৎপাদিত বীজ সরবরাহের সুযোগ নিশ্চিত করছেন। এতে সৎ ও মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনকারী কৃষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
শুধু বীজ সংগ্রহেই নয়, শ্রমিকদের মজুরি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি মাসে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিকের হিসাব দেখিয়ে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। গত জুন মাসেই প্রায় ২০ থেকে ২৫টি অতিরিক্ত অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সেই হিসাবের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক শ্রমিক।
আরও অভিযোগ, অনেক শ্রমিক ৩০ দিন কাজ করলেও দুইটি হিসাবে ৬০ দিনের বিল তোলা হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ অফিসে জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে প্রায় পাঁচ লাখ টাকারও বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এটি এক মাসের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে অনিয়ম চলছে।
এদিকে বীজ গ্রেডিংয়ের পর কৃষকদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত বীজ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রতি বস্তা থেকে দেড় থেকে দুই কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত বীজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। ফলে তারা প্রকৃত হিসাবের তুলনায় কম ওজনের বিল পাচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
অনেক কৃষক জানিয়েছেন, সম্মানের কথা ভেবে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারছেন না। তবে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তারা সরকারি বীজ উৎপাদন কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তারা জানান, ডিডির এসব অনিয়মে বাধা দিলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং কাজ থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এছাড়া অফিসের বিভিন্ন খাতের বরাদ্দের অর্থেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিম্নমানের পণ্য কিনে অতিরিক্ত মূল্যের বিল দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অথচ কার্যকর কোনো নজরদারি নেই।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সরকারি শ্রমিকদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা। অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসের পাঁচ থেকে সাতজন শ্রমিককে নিয়মিত ব্যক্তিগত বাসায় রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার এবং অতিথি আপ্যায়নের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ তাদের বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে।
এছাড়া দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করলেও সরকারি বাসাভাড়া সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি রেস্ট হাউজেও অবস্থান করছেন ওই কর্মকর্তা। অভিযোগকারীদের দাবি, এটি সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী এবং দ্বৈত সুবিধা গ্রহণের শামিল।
তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত ডিডির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অর্থ, কৃষকের স্বার্থ এবং বীজের গুণগত মান রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? নাকি অভিযোগগুলোও হারিয়ে যাবে নথির স্তূপে?
Leave a Reply