জাতির বিবেক প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংবিধানিক অধিকার বঞ্চিত নিপিড়ীত জনতার অধিকার আদায়ের একমাত্র কন্ঠস্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের পক্ষ থেকে আপনাদের সকলকে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘ সময় ধরে চলে তথাকথিত বিশেষ শাসনব্যবস্থা এবং ১৯৯৭ সালের বিতর্কিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র মাধ্যমে এখানকার একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের মূল ধারার চেয়েও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি, (গত ২১ জুন) বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রীর নিকট দু’জন উপজাতি সংসদ সদস্য, একজন সংরক্ষিত নারী উপজাতি সদস্য এবং খাগড়াছড়ির একজন বাঙালি সংসদ সদস্যসহ মোট ৪ জন যৌথ স্বাক্ষরে একটি চিঠি প্রেরণ করেছেন। চিঠির মূল উদ্দেশ্য ছিল আয়কর আইন ২০২৩-এর ৬ষ্ঠ তফসিলের প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিল করে উপজাতিদের জন্য পূর্বের ন্যায় পূর্ণাঙ্গ আয়কর অব্যাহতি বহাল রাখা। এই চিঠিতে বৈষম্যমূলক মানসিকতা, ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি এবং রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র কাঠামোতে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থে এই চিঠির অযৌক্তিক দাবিগুলোর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
“পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের দেশের মূল স্রোতধারায় আত্মীকরণের বিভিন্ন উপায়ের মধ্যে আয়কর হতে অব্যাহতির বিষয়টি অন্যতম। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৬ষ্ঠ তপশীলের অনুচ্ছেদ ২৭ এ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের আয়কর অব্যাহতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, যা বহাল রাখা হয়েছে আয়কর আইন ২০২৩ এর ১৯নং অনুচ্ছেদে।
১৯৮৪ সাল থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে উপজাতিরা করমুক্ত সুবিধা ভোগ করে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং ঠিকাদারি খাতের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। করমুক্ত সুবিধার সুযোগ নিয়ে উপজাতিদের একটি বিশাল অংশ আজ অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। উপজাতীয় করমুক্ত সুবিধার অন্তরালে লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে শত কোটি টাকার মালিক হচ্ছে উপজাতি ঠিকাদাররা অপরদিকে বিশাল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। যেখানে একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালী বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত ট্যাক্স বা কর দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার সচল রাখছেন, সেখানে সমান বা তার চেয়ে বেশি আয় করেও উপজাতিদের করের বাইরে রাখা সুস্পষ্টভাবে সংবিধানে বর্ণিত “নাগরিকদের সমঅধিকার” নীতির পরিপন্থী। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হয়ে যাওয়ার পরও ‘মূল স্রোতধারায় আত্মীকরণ’-এর দোহাই দিয়ে অনন্তকাল কর মওকুফ চাওয়ার দাবি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। জনাব তারেক রহমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বৈষম্য দূর করতে কর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ। এই কর মওকুফ বাতিলের প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিরুদ্ধে গত ১৮ জুন জাতীয় সংসদে রাঙামাটি ২৯৯নং আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট দীপেন দেওয়ান তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি উপজাতীয়দের বেতন ও আর্থিক সম্পদের ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে তা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানান।
“পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উপজাতিগণের সিংহভাগের আয়ের উৎস হচ্ছে জুমচাষ ও কৃষি। সমতলের ন্যায় ধানীজমি/কৃষিজমি পার্বত্য চট্টগ্রামে নেই বললেই চলে। উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ধানীজমির প্রায় ৭০ শতাংশ (৫৫০০০ একর) কাপ্তাই বাঁধের কারণে পানিতে তলিয়ে গেছে যার সিংহ ভাগ মালিক ছিলেন উপজাতীয় সম্প্রদায়। উপজাতিগণের অন্যান্য পেশার মধ্যে নগণ্য পরিমাণ দোকানদার এবং হাজার পাঁচেক ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির চাকুরীজীবী ও সরকারি চাকুরীজীবী রয়েছেন। এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষের খাবার পানির প্রধান উৎস ঝর্ণা, লেক/পুকুর, ৪৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা হতে বঞ্চিত। এখনো ৫০ শতাংশের মানুষ স্বাস্থ্য সেবা সুবিধা হতে বঞ্চিত। এখনো অনেক উপজেলায় পাকা সড়ক নেই। নাগরিক সুবিধা হতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখনো পিছিয়ে রয়েছে।” সংসদ সদস্যদের দেওয়া এই তথ্যগুলো অত্যন্ত একপেশে এবং বিভ্রান্তিকর এবং মিথ্যা ও বানোয়াট।
বাস্তবতা হলো, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার সিংহভাগ সুযোগ-সুবিধা উপজাতিরাই একচেটিয়া ভোগ করে আসছে। উপজাতি কোটা, সরকারি চাকরিতে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ নিয়োগ, দেশী-বিদেশী এনজিওর বিপুল অনুদান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশেষ বরাদ্দ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ফান্ডিংয়ের সুবিধা শুধুমাত্র উপজাতিরাই পায়। পার্বত্য চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির অপব্যবহার করে স্থানীয় হেডম্যান, কার্বারী এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সব স্তরে উপজাতিরা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। করমুক্ত সুবিধার কারণে উপজাতি ব্যবসায়ীরা ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবসা করে ঘরে বসে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটছে। পক্ষান্তরে, বাঙালী ব্যবসায়ীরা করের বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। সবদিক থেকে বাঙালীদের আজ “ঠুটো জগন্নাথ” বানিয়ে রাখা হয়েছে। অতএব, সাধারণ জুমচাষীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে উপজাতি ধনী চাকরিজীবী ও কোটিপতি ঠিকাদারদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার এই চক্রান্ত মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উপজাতিরা কখনোই জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে মন থেকে সমর্থন করেনি। তারা সর্বদা তাদের সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস ইউপিডিএফ বা কেএনএফ-এর নির্দেশিত পথে চলেছে। চুক্তির পর তারা আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করেছে, আবার নিজেদের স্বার্থে জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে ‘না ভোট’ দেওয়ার ইতিহাসও তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাঙামাটিতে জেএসএস কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তারা কৌশলে দীপেন দেওয়ানকে তথা বিএনপিকে সমর্থন দেয়। এটি ছিল তাদের সাময়িক কৌশল, কোনো আদর্শিক ভোট ব্যাংক নয়। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ১ জন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যসহ মোট ৪ জন সংসদ সদস্যদের এই প্রস্তাব; শুধুমাত্র উপজাতিদের জন্য কর মওকুফের বিষয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর মাধ্যমে উপজাতিরা শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও কর ফাঁকি দেওয়ার আইনি বৈধতা চাইছে। যদি তাদের এই দাবি মেনে নিয়ে ফার্ম বা কোম্পানিকে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বড় বড় ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে, যা দেশের মূল অর্থনৈতিক রাজস্ব নীতিকে পঙ্গু করে দেবে। এটি পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালী ব্যবসায়ীদের চিরতরে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার একটি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক নীলনকশা।
রাষ্ট্রের উচিত কোনো প্রকার রাজনৈতিক হুমকিতে মাথা নত না করে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রস্তাবিত সংশোধনী কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব। সুতরাং রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ৫৪ শতাংশ বাঙালী সহ সকল সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য এক নীতিতে কর আরোপ বা মওকুফ করার জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি। সেই ক্ষেত্রে যেহেতু এখন আর কেউ পিছিয়ে পড়া নেই, সকলকে করের আওতায় আনলে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাবে। যে অঞ্চলে কর মওকুফ থাকে সেই অঞ্চলকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। কারণ করহীন জনগোষ্ঠী অনেকটা ভিখারির পর্যায় চলে যায়। তাই সকলকে করের আওতায় আনার জন্য সদাশয় সরকারের নিকট জোর দাবী জানাচ্ছি।
পরিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ উপস্থিত সম্মানিত সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে আমাদের এই দাবী সরকারের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য ও জনস্বার্থে প্রচারের জন্য আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি। আপনারা অনেক মূল্যবান সময় দিয়ে আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন এজন্য আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞ জানাচ্ছি।
Leave a Reply