রাজধানী ঢাকায় যেতে কিংবা শরীয়তপুর থেকে মাওয়ায় পৌঁছাতে হাজারো মানুষকে নির্ভর করতে হতো এই লঞ্চগুলোর ওপর। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চগুলো পদ্মার উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে চলাচল করত, আর নদী পার হতে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো ঘাটে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। একসময় যে লঞ্চগুলো শরীয়তপুর-মাওয়া নৌপথে মানুষের প্রধান ভরসা ছিল, সেগুলোর অধিকাংশই এখন আর এই রুটে দেখা যায় না। কিছু লঞ্চ অন্য নৌপথে চলাচল করছে, আবার কিছু লঞ্চ দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে পদ্মা পাড়ের মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের যেন সমাপ্তি ঘটেছে।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে ঈদ, পূজা কিংবা ছুটির মৌসুমে মাওয়া ও শরীয়তপুর ঘাটে হাজার হাজার যাত্রীর উপচে পড়া ভিড় ছিল নিত্যদিনের চিত্র। যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ফেরি ও লঞ্চের জন্য অপেক্ষা, নদীর তীব্র স্রোত, বৈরী আবহাওয়ায় যাত্রা বন্ধ হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। অনেকেই লঞ্চের ছাদে বসে পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগ করতেন, আবার অনেকে নদীর উত্তাল ঢেউয়ের কারণে আতঙ্কেও থাকতেন।
তবে সেই কষ্টের যাত্রার মধ্যেও ছিল অসংখ্য স্মৃতি। লঞ্চের ক্যান্টিনে চা পান, নদীর মাঝখানে শীতল বাতাস, হকারদের হাঁকডাক, আত্মীয়-স্বজনকে বিদায় বা স্বাগত জানানোর আবেগ—এসবই আজ অনেকের কাছে নস্টালজিয়ার অংশ হয়ে আছে। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর শরীয়তপুর থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে আসে ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে উন্নয়নের এই নতুন অধ্যায়ের মধ্যেও পদ্মার বুক চিরে চলা সেই চিরচেনা লঞ্চগুলোর স্মৃতি এখনও অনেকের হৃদয়ে অমলিন।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, পদ্মা সেতু মানুষের জীবন সহজ করেছে, কিন্তু নদীপথের সেই দীর্ঘ যাত্রা, লঞ্চের সাইরেনের শব্দ আর ঘাটের কোলাহল আজ শুধুই স্মৃতি। নতুন প্রজন্ম হয়তো আর কখনও সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী হবে না। একসময় শরীয়তপুর থেকে মাওয়া যাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল এই লঞ্চগুলো। আজ সেগুলো ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেও পদ্মার ঢেউ, ঘাটের ব্যস্ততা আর সেই স্মৃতিময় যাত্রা এখনও অনেকের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। “আপনারও কি মনে আছে সেই লঞ্চযাত্রার দিনগুলো?”
Leave a Reply