admin
১৯ জুন ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

জেরুজালেম কেন মুসলিমদের হৃদয়ের শহর?

জেরুজালেম কেন মুসলিমদের হৃদয়ের শহর?

মুসলিমদের কাছে জেরুজালেম শুধু একটি শহর নয়, বরং ঈমান, ইতিহাস এবং আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আরবিতে আল-কুদস বা বায়তুল মুকাদ্দাস নামে পরিচিত এই প্রাচীন নগরী যুগের পর যুগ ধরে মুসলিমদের ধর্মীয় আবেগ, আধ্যাত্মিকতা এবং সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

মক্কা ও মদিনার পর ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত জেরুজালেমের মর্যাদা সরাসরি জড়িয়ে আছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র মিরাজের ঘটনার সঙ্গে।

পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, এক অলৌকিক রাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় ‘ইসরা’। এরপর সেখান থেকেই তিনি সাত আসমান অতিক্রম করে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান, যা ‘মিরাজ’ নামে পরিচিত।

ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, মসজিদুল আকসায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এই ঘটনা শুধু একটি অলৌকিক সফর নয়, বরং নবুয়তের ধারাবাহিকতার এক প্রতীকী ঘোষণা। আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা আলাইহিমুস সালামসহ সকল নবীর দাওয়াতের পূর্ণতা আসে ইসলামের মাধ্যমে।

এ কারণেই জেরুজালেম মুসলিমদের কাছে শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ড নয়, বরং নবীদের স্মৃতিবিজড়িত এক পবিত্র ভূমি।

ইসলামের ইতিহাসে জেরুজালেমের আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব হলো— এটি ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা জেরুজালেমের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে কিবলা পরিবর্তন হয়ে মক্কার কাবাঘরের দিকে নির্ধারিত হয়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু শান্তিপূর্ণভাবে জেরুজালেম গ্রহণ করেন। বিজয়ী হয়েও তিনি প্রতিশোধ বা নিপীড়নের পথ বেছে নেননি। বরং খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।

তার সেই ন্যায়ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা জেরুজালেমকে পরিণত করেছিল বহুধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য নগরীতে।

পরবর্তী সময়ে উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতিমি এবং অটোমান শাসনামলেও জেরুজালেম জ্ঞান, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

উমাইয়া খিলাফতের সময় নির্মিত কুব্বাতুস সাখরা আজও ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এর সোনালী গম্বুজ বিশ্বজুড়ে জেরুজালেমের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

তবে ইতিহাসের এক পর্যায়ে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করে নেয়। সেই সময় মুসলিম ও ইহুদিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু ১১৮৭ সালে মুসলিম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন।

বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও সহনশীলতার নজির স্থাপন করেন। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন এবং ইহুদিদের আবারও শহরে ফিরে আসার সুযোগ দেন।

এই কারণেই মুসলিম ইতিহাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির জেরুজালেম পুনরুদ্ধার একটি গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমান সময়ে জেরুজালেমকে ঘিরে রাজনৈতিক বাস্তবতা মুসলিম বিশ্বে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিন সংকট এবং মসজিদুল আকসাকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা মুসলিমদের আবেগকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান বিশ্বাস করেন, জেরুজালেম শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং এটি তাদের বর্তমান সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

মুসলিমদের কাছে এই শহর নবীদের উত্তরাধিকার, মিরাজের স্মৃতি, প্রথম কিবলা এবং ইসলামী সভ্যতার গৌরবের প্রতীক। তাই জেরুজালেমের নাম উচ্চারিত হলে আজও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মুসলমানের হৃদয়ে বিশেষ আবেগ সৃষ্টি হয়।

জেরুজালেম শুধুই একটি শহর নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিকতার এক অবিনাশী প্রতীক।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য কমতে পারে ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতির চাপে ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র

১

নুরকে ক্ষেপানোর খেসারত জামায়াত-এনসিপিকে করুণভাবে দিতে হবে : রাশেদ খান

২

যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে পাকিস্তানের পাশে থাকবে ভারত: বিজেপি নেতার

৩

আশুলিয়ায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার ৩, হায়েস-ওয়াকিটকি ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার