বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের মাধ্যমে ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে গুঁড়া মাছ, মাছের ডিম ও মা মাছ নিধনের অভিযোগ উঠেছে। এতে সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উপকূলীয় এলাকার সাধারণ জেলেরা। সাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের তৎপরতা বন্ধ এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় জেলেরা। এ সময় তাঁরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবী ইউনিয়ন বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন একটি উপকূলীয় জনপদ। এ এলাকার বহু মানুষের জীবিকা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন সাগরে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় জেলেরা। তাঁদের পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর অন্যতম উৎস মাছ ধরা। কিন্তু সাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের অবাধ বিচরণ এবং ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে মাছ আহরণের কারণে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় উপজেলার মৌডুবী ইউনিয়নের নিচকাটা সাগরপাড় বাজারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সাধারণ জেলেরা অংশ নিয়ে অবৈধ ট্রলিং বোটের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ আহরণ বন্ধের দাবি জানান। তাঁদের অভিযোগ, ছোট ফাঁসের জালে শুধু বড় মাছই নয়, বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ, মাছের পোনা, ডিম ও প্রজননক্ষম মাছও ধরা পড়ছে। ফলে সাগরে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
নিচকাটা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি শামিম ফরাজির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মৌডুবী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বশির ফরাজি ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তুহিন প্যাদা। এ সময় ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান (তরুণ)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় সাধারণ জেলেরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের তৎপরতা বন্ধ করা না গেলে সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়বে। নির্বিচারে ছোট মাছ ও মাছের পোনা আহরণ করা হলে ভবিষ্যতে সাগরে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন সাধারণ জেলেরা, যাঁরা প্রতিদিন সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
তাঁরা আরও বলেন, সাধারণ জেলেরা নিয়মিত সাগরে জাল ফেলেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না। মাছের পরিমাণ কমে গেলে তাঁদের আয় কমে যায়, অথচ নৌকা, জাল, জ্বালানি ও পরিবারের ভরণপোষণের খরচ বহন করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে মাছের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে জেলেদের জীবন-জীবিকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, অবৈধ ট্রলিং বোটের মাধ্যমে ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে মাছ আহরণ অব্যাহত থাকলে একদিকে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ ধরা জেলেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। তাই শুধু সাময়িক অভিযান নয়, সাগরে নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা প্রয়োজন।
মানববন্ধন থেকে অবৈধ ট্রলিং বোটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য উপদেষ্টা, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সাগরে অবৈধভাবে মাছ আহরণকারী বোট শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, ছোট ফাঁসের জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানান তাঁরা।
স্থানীয় জেলেদের মতে, সামুদ্রিক মাছ ও মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ও জেলেদের জীবিকা টেকসই রাখার সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি সাগরে প্রচলিত মৎস্য আহরণবিধি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
অবৈধ ট্রলিং বোটের তৎপরতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছেন মানববন্ধনে অংশ নেওয়া জেলেরা। তাঁদের দাবি, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা গেলে শুধু বর্তমান জেলে পরিবারগুলোই উপকৃত হবে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সাগরের মাছের সম্পদ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন