দেশে আবারও চালু হতে যাচ্ছে ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত আইনে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে এটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে মতামতও চেয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
খসড়া অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হবেন গ্রাম সরকারের প্রধান। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য থাকবেন উপদেষ্টা হিসেবে। ১৫ সদস্যের মধ্যে গণ্যমান্য ব্যক্তি, সমাজসেবক, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, যুব প্রতিনিধি, পল্লী চিকিৎসক, নিকাহ রেজিস্ট্রার ও সমবায় সমিতির সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন পুরুষ ও একজন নারী সদস্য এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখার কথাও বলা হয়েছে, যদি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে এমন প্রতিনিধি থাকেন।
সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের কমপক্ষে ১০ শতাংশের উপস্থিতিতে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হ্যাঁ-না ভোটের প্রস্তাব রয়েছে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে প্রথম সভা থেকে পাঁচ বছর।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে গ্রাম পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধ। নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক এবং জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এসব বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে গ্রাম সরকারের।
এ ছাড়া স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং গ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে খসড়ায়। গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও কালভার্ট উন্নয়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনাও করবে এই সংস্থা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও সহায়ক ভূমিকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করবে গ্রাম সরকার। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন, কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং সংকটের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানানোর দায়িত্বও থাকবে।
গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমবায় সমিতি গঠন, ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য চাষ ও পশুপালনে মানুষকে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, পরিবেশ ও প্রাণী সংরক্ষণ এবং নারী, শিশু, যুবক ও প্রবীণদের কল্যাণেও বিভিন্ন কার্যক্রম নিতে পারবে গ্রাম সরকার।
খসড়ায় সদস্যদের যোগ্যতা ও অপসারণের বিধানও রাখা হয়েছে। যথাযথ কারণ ছাড়া পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে তদন্তের পর সদস্যকে অপসারণ করা যেতে পারে।
গ্রাম সরকারের কার্যক্রম তদন্তের ক্ষমতা থাকবে জেলা প্রশাসকের। তদন্তে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা জনস্বার্থবিরোধী কাজের প্রমাণ পাওয়া গেলে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে গ্রাম সরকার বাতিল করার প্রস্তাব রয়েছে। বাতিল হলে নতুন গ্রাম সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত এডহক কমিটি দায়িত্ব পালন করবে।
উল্লেখ্য, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সত্তরের দশকে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। ২০০৩ সালে এ নিয়ে আইন করা হলেও পরে তা বাতিল করা হয়। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকেও গ্রাম সরকার পুনর্বহালের প্রস্তাব আলোচনায় আসে।
এখন ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। আইনটি চূড়ান্ত হলে গ্রামীণ উন্নয়ন, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা ও অপরাধ প্রতিরোধে প্রস্তাবিত সংস্থাটির ভূমিকা কী হবে, তা নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য করুন