বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী খ্যাত চুয়াডাঙ্গার রেলস্টেশনটি ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক রেলস্টেশনটির মাধ্যমে ১৮৫৯ সালে চুয়াডাঙ্গা হতে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত সর্বপ্রথম রেল যোগাযোগের কাজ শুরু হয়। ঠিক একই বছরে চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের কাজও শুরু হয়।
১৬৬ বছরের দীর্ঘ সময় পাড়ি দেয়া চুয়াডাঙ্গার পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনটি নতুন ভবনের কাজ নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। এরপরও শেষ হয়নি চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের আধুনিকায়ন ও নতুন দ্বিতল ভবন নির্মাণকাজ। কয়েক দফা বন্ধ থাকার পর আবারও চলছে নির্মাণকাজ। প্ল্যাটফর্মের কাজ অনেকটা শেষ হলেও ভবনের কাজ চলছে ধীরগতিতে। ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। আগামী বছরের মাঝামাঝি পুরো কাজ শেষ করার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ চলায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। পুরোনো প্ল্যাটফর্ম ও ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলায় নেই পর্যাপ্ত বসার জায়গা, বিশ্রামাগার ও শৌচাগারের সুবিধা। মূল ভবনের বাইরে অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার চালু থাকায় নতুন ও দূর-দূরান্তের যাত্রীরা পড়ছেন বিভ্রান্তিতে। সংকট রয়েছে স্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও।
২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে চাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরটিসি -এস এইচজে জয়েন্ট ভেঞ্চার নতুন রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চুক্তিবদ্ধ হয়। চুক্তিবদ্ধ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ৫৪০ দিন নির্ধারিত সময়ে স্টেশনটির নির্মাণ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। দ্বিতলভবন বিশিষ্ট রেলওয়ে স্টেশনটির নির্মাণ কাজ চলমান আছে।
এই প্রকল্পের অধীনে ১২ হাজার ৪৭০ বর্গফুট আয়তনের দ্বিতল বিশিষ্ট স্টেশনে ভবন নির্মাণ, যাত্রী সাধারণের নিরাপদ ও আরামদায়ক করার জন্য বর্তমান প্ল্যাটফর্মকে ১২ ফুট থেকে ২৫ ফুট প্রশস্তকরণ, স্টেশন ভবন সংলগ্ন প্ল্যাটফর্মের সেড আধুনিকায়ন ও স্টেশনের সামনের অংশের ছাদটিতে জনসাধারণের জন্য বিশাল পার্কিংয়ের সুবিধা রাখা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সে হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও পুরো কাজ শেষ হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নির্মাণকাজ অনেকটাই এগিয়েছে। নতুন প্ল্যাটফর্মে ছাউনির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। কোথাও প্লাস্টার, কোথাও টাইলস, আবার কোথাও রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার রেল পাড়ার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, চুয়াডাঙ্গায় রেল স্টেশনটি অনেক পুরাতন। দীর্ঘদিন ধরে ভবনগুলো ব্যবহার হয়েছে। বর্তমান ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সরকার নতুন একটি স্টেশন নির্মাণ করছে। আশা করছি স্টেশনটি খুব দৃষ্টিনন্দন স্টেশন হবে। কিন্তু কাজটি দীর্ঘদিন ধরে চলায় যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ট্রেনের জন্য সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, অথচ বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও নারী-শিশুদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ করে যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা চালু করা হোক।’বর্তমান সরকার দৃষ্টিনন্দন চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করায় আমরা অনেক খুশি।
আরেক যাত্রী রকিব বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে কাজ চলছে। এখনো ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। নির্মাণ কাজ চলতে পারে, কিন্তু এই সময় যাত্রীদের বসার জায়গা, টয়লেট ও টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা যেন ঠিক থাকে, সেটাও কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত।’
মামুন নামের এক বলেন, স্টেশনে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট এবং বসার জায়গা। কিন্তু নির্মাণকাজের কারণে এখন এসব সুবিধা খুবই সীমিত। বাচ্চা বা বয়স্ক কাউকে নিয়ে এলে সমস্যাটা আরও বেশি বোঝা যায়।’
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিজানুর রহমান বলেন, ‘নির্মাণকাজ চলমান থাকায় স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীসেবা ও আমাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত জায়গায় অফিসের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। যাত্রীদের বসার স্থান, টিকিট সংগ্রহ এবং অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রেও সাময়িক অসুবিধা রয়েছে। আমরা যতটা সম্ভব বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে যাত্রীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন ভবন ও অন্যান্য কাজ শেষ হলে এসব সমস্যা আর থাকবে না।’
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নকশা-সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে মাঝখানে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। এখন আবার নিয়মিত কাজ চলছে। ভবনের মূল কাঠামোর কাজ অনেকটাই হয়ে গেছে। বর্তমানে প্লাস্টার, টাইলস, রংসহ ফিনিশিংয়ের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনটি জেলার ঐতিহ্য বহন করতো। তবে আধুনিক দ্বিতল বিশিষ্ট স্টেশন নির্মাণ শেষ হলে যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বহু গুণে বাড়বে। সরকার বর্তমানে রেলখাতে ব্যাপক উন্নয়ন করছে। চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন দিয়ে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে।
function PlayerjsAsync(){} if(window["Playerjs"]){PlayerjsAsync();}