ঢাকার ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বিপুল সম্পদ, মদ ব্যবসা, বার ও ওয়্যারহাউজ এবং কথিত অবৈধ অর্থ লেনদেনের নানা অভিযোগ। এসব অভিযোগের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে ইউটিউবার সালমান মুক্তাদির এবং তার স্ত্রী দিশা ইসলামের নামও।

দাবি করা হচ্ছে, নুরুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। আরও দাবি করা হচ্ছে, তার ব্যবসার বড় একটি অংশ মদ আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে তার ব্যবসায়িক স্থাপনা।

তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এসব দাবির সত্যতা কতটুকু?

কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে কারও বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যবসা, অর্থপাচার, ঘুষ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে প্রয়োজন হয় নথি, তদন্ত এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগে বলা হচ্ছে, নুরুল ইসলামের একাধিক বার এবং ওয়্যারহাউজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন এবং কথিত অর্থের উৎস গোপন করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মদ আমদানি, গুদামজাতকরণ এবং বিভিন্ন বার ও লাউঞ্জে বিক্রির একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন করা হয়।

এমনকি স্টক, চালান, ব্যাচ নম্বর এবং ব্যবসায়িক হিসাবের মধ্যেও কথিত গরমিল থাকার দাবি করা হয়েছে।

কিন্তু এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি, আদালতের রায় বা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে এসব দাবিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে বলা যায়।

এবার আসা যাক সালমান মুক্তাদির ও দিশা ইসলামের প্রসঙ্গে।

সালমান মুক্তাদির বাংলাদেশের পরিচিত ইউটিউবার ও কনটেন্ট নির্মাতা। ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি দিশা ইসলামকে বিয়ে করেন। তাদের বিয়ের খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

দিশা ইসলামের আগের সংসার এবং তার সন্তান থাকার বিষয়টিও সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে দাবি করা হচ্ছে—দিশা ইসলাম বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী এবং সেই সম্পদের কারণে সালমান মুক্তাদির তাকে বিয়ে করেছেন—এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি প্রকাশ্যে নেই।

একইভাবে দিশার পরিবারের সঙ্গে কথিত মদ ব্যবসা কিংবা কোনো অবৈধ অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন দাবিও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে।

কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কারও বিয়ে হয়েছে—এটি নিজে থেকে ওই ব্যক্তির ব্যবসা, সম্পদ কিংবা কথিত অপরাধের সঙ্গে অন্যজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়।

তাই সালমান মুক্তাদিরকে মাদক ব্যবসায়ী বা কোনো অবৈধ মদ ব্যবসার নিয়ন্ত্রক হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে প্রয়োজন সরাসরি প্রমাণ—যেমন কোম্পানির মালিকানা, ব্যবসায়িক নথি, লাইসেন্স, আর্থিক লেনদেন অথবা তদন্ত সংস্থার তথ্য।

এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ ছড়িয়েছে।

মোঃ হাসান মারুফ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৫ সালের মার্চে এই পদে যোগ দেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে পদ পাওয়ার এবং কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার যে অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

অতএব, এসব অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি সত্যিই কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবৈধ মদ আমদানি, কর ফাঁকি, স্টক গরমিল কিংবা অর্থপাচারের অভিযোগ থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি তা তদন্ত করছে?

কারণ মদ আমদানি ও বিক্রির ব্যবসা বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত একটি খাত। এখানে লাইসেন্স, আমদানি, সংরক্ষণ, বিক্রি, কর ও ভ্যাট—সবকিছুর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ থাকলে লাইসেন্স, আমদানি নথি, গুদামের স্টক, বিক্রির হিসাব এবং কর-ভ্যাটের তথ্য যাচাই করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।

আর যদি সত্যিই কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব স্টকের বড় ধরনের পার্থক্য থাকে, তাহলে সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে।

একইভাবে কারও সম্পদের পরিমাণ যদি হাজার হাজার কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়, তাহলে সেই সম্পদের উৎস কী—এ প্রশ্নের উত্তরও নথির মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।

কোম্পানি মালিকানা, জমি ও ভবনের রেকর্ড, ব্যাংকিং লেনদেন, আয়কর নথি এবং ব্যবসায়িক হিসাব—সব মিলিয়েই প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

সুতরাং নুরুল ইসলামকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ২০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ, কথিত মদ ব্যবসার সাম্রাজ্য, বার ও ওয়্যারহাউজের নেটওয়ার্ক কিংবা সালমান মুক্তাদিরের সঙ্গে এসব সম্পদের সম্পর্ক—প্রতিটি দাবিই আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক জিনিস নয়।

কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো দাবি করলেই সেটিকে সংবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই এখন অপেক্ষা নথির।

নুরুল ইসলামের প্রকৃত ব্যবসা কী, তার সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ কত, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা তার নামে, এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও করের তথ্য কী বলছে—এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারি নথি ও স্বাধীন তদন্ত থেকেই পাওয়া সম্ভব।

একইভাবে সালমান মুক্তাদির কিংবা দিশা ইসলামের বিরুদ্ধে যদি কোনো আর্থিক বা অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে, সেটিও নথিসহ সামনে আসা প্রয়োজন।

কারণ সত্য উদঘাটনের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো—অভিযোগ নয়, প্রমাণ।

নুরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিপুল সম্পদ ও কথিত অবৈধ ব্যবসার অভিযোগ সত্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো বাস্তবতা—তার উত্তর মিলবে কেবল নির্ভরযোগ্য নথি, তদন্ত এবং প্রমাণ সামনে এলে।

আর সেই পর্যন্ত এসব দাবিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত, নিশ্চিত সত্য হিসেবে নয়।

function PlayerjsAsync(){} if(window["Playerjs"]){PlayerjsAsync();}