যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা আবারও সক্রিয় হতে পারে—এমন আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের তেলের দামই ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ২ দশমিক ১৬ ডলার কমে দাঁড়ায় ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে ২ দশমিক ১৫ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২ দশমিক ১৪ শতাংশ। এতে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই বিক্রি হচ্ছিল ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে।

অর্থাৎ, কয়েকদিন ধরে ১০০ ডলারের ওপরে থাকা ডব্লিউটিআই আবারও সেই গুরুত্বপূর্ণ সীমার নিচে নেমেছে। একই সময়ে ব্রেন্টের দামও ১০২ ডলারের নিচে চলে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনা। চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে এই সপ্তাহে কূটনৈতিক কোনো পথ বেরিয়ে আসতে পারে—এমন আশায় তেলের দামে থাকা ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য কিছুটা কমছে।

তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, এই কূটনৈতিক আশাবাদ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। রোববার দুই পক্ষ থেকেই নতুন করে হুমকি ও পাল্টা হুমকির খবর এসেছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বসতে আগ্রহী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্কে আসার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনায় ফেরার জন্য তেহরান কিছু শর্ত জানিয়েছে।

তবে কূটনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতিও এখনো বেশ উত্তপ্ত।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবুর কিছু স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। ইয়ানবু সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলোর একটি।

হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। এর ফলে সৌদি আরবকে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে দৃশ্যমানভাবে মাত্র এক ডজন পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে, যেখানে তার আগের সপ্তাহান্তে সংখ্যা ছিল ৩৫টি।

তবু মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। সৌদি আরব বিকল্প পথে এবং হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির তেল রপ্তানি দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে বলে কেপলারের প্রাথমিক তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রয়টার্স। আগস্টে যা নেমে গিয়েছিল প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেলে।

ফলে বর্তমান তেলের বাজারে একদিকে যুদ্ধ ও সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা—দুই ধরনের সংকেতই একসঙ্গে কাজ করছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সত্যিই কোনো আলোচনার পথ তৈরি হয় কি না, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয় কি না এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানি কতটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়—এসব বিষয়ই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাই সোমবারের দরপতনকে স্থায়ীভাবে তেলের দাম কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার চেয়ে, বরং যুদ্ধ ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

function PlayerjsAsync(){} if(window["Playerjs"]){PlayerjsAsync();}