রবিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৩, ০৯:৩০ অপরাহ্ন

পুরো পরিবার ট্রমায়, এখন দায় কে নেবে!

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২২
fardin-death-20221219142532

‘বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ নিখোঁজের পর থেকেই মেয়েটা হয়রানির শিকার। এরপর তো সুনির্দিষ্ট ক্লু ছাড়াই হত্যা মামলায় আসামি করে বুশরাকে জেলে পাঠানো হলো। কিছু সময় কাটালেই কেউ খুনি হয়ে যায় না। এটা আমরা বলেছি, অনুরোধ করেছি, কিন্তু শোনা হয়নি। আমার মেয়েটার সর্বনাশ যা হবার তো হয়েই গেল। ডিবি-র‌্যাব তো বলেছে, ফারদিন খুন হয়নি, আত্মহত্যা করেছে।’

রোববার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে এভাবেই নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন ফারদিন হত্যা মামলায় কারাগারে থাকা বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরার চাচা মাজহারুল ইসলাম।

আলোচিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশ নিখোঁজের তিন দিন পর গত ৭ নভেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা থেকে উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। সেসময় তার ব্যবহৃত ফোন, ঘড়ি ও মানিব্যাগ সঙ্গেই পাওয়া গেছে।

ফারদিনের পরিবার জানিয়েছিল, ৪ নভেম্বর বিকেল তিনটার দিকে বুয়েটের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। ৫ নভেম্বর (শনিবার) সকাল ১০টায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষায়ও অংশ নেননি তিনি। তার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার নয়ামাটি গ্রামে। তারা রাজধানীর ডেমরার শান্তিবাগের একটি বাসায় থাকতেন।

ফারদিনকে খুন করা হয়েছে দাবি করে রামপুরা থানায় দায়ের করা হত্যা হয়। মামলায় ‘হত্যা করে লাশ গুম’ করার অভিযোগ আনেন ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন। সেই মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয় বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরাকে। ১০ নভেম্বর গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার অভিযোগে ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা বলেন, ফারদিনকে রামপুরা এলাকায় বা অন্য কোথাও হত্যাকারীরা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এ হত্যার পেছনের তার বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরার ইন্ধন রয়েছে।

৭ নভেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। মরদেহ ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা জানান, ‘তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে’।

মামলার তদন্তভার ডিবি পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এরপর মাদক সংশ্লিষ্টতা, মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে খুন, কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয় সামনে আসে। সর্বশেষ তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবি পুলিশ ও র‌্যাব তদন্ত অগ্রগতি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছে জানায়, স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ বা আত্মহত্যা করেছেন ফারদিন। ডিবি পুলিশ জানায়, ফারদিনের মৃত্যুর ঘটনায় জেলে থাকা বুশরা নির্দোষ।

যোগাযোগ করা হলে বুশরার চাচা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ফারদিনের বাবাকে বার বার বলেছিলাম, সন্দেহভাজন হিসেবে রাখতে পারেন সর্বোচ্চ, এক নম্বর আসামি কইরেন না। কিন্তু তিনি শোনেননি। তিনি এক নম্বর আসামিই করেন। বুশরাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।

চাচা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ফারদিন-বুশরার মধ্যে কখনো ফোনে কথা হয়নি। তবে ফেসবুকে যোগাযোগ হতো। মেসেঞ্জারে চ্যাটিং হতো। ফারদিন ও বুশরা ডিবেট করতো। ডিবেটের সূত্র ধরেই নানা বিষয়ে ওদের মধ্যে যোগাযোগ হতো। বড় ভাই হিসেবে ফারদিনের কাছ থেকে ডিবেটের তথ্য-উপাত্তসহ নানা সহযোগিতা নিতো বুশরা।

চাচা মাজহার আরও বলেন, ডিবি পুলিশ মামলা তদন্ত করছে। র‌্যাবও ছায়া তদন্ত করছে। আমরা ডিবি ও র‌্যাব উভয় তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের জানিয়েছেন বুশরা নির্দোষ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সময় ডিবি পুলিশ মামলা থেকে বুশরার নাম বাদ দেওয়ার কথা আমাদের জানিয়েছেন।

মাজহারুল ইসলাম বলেন, একটা ছেলে খুন বা মারা গেলে পরিবারের কী অবস্থা হয় সেটা বুঝি। ফারদিন তো নেই মারা গেছে, সে তো আর ফিরবে না, কিন্তু বুশরা? বুশরা তো থেকেও আমাদের মাঝে নেই, নির্দোষ হয়েও জেল খাটছে। পরিবারের অবস্থাটা একবার বোঝেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বয়লা এলাকায় বসবাস করেন আমাতুল্লাহ বুশরার পরিবারের সদস্যরা। তার বাবা মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে সবুজ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। ২০১৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মা ইয়াসমিন গৃহিণী।

তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় বুশরা। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করছেন। নিজে ডিবেট করতো। ডিবেটের সূত্র ধরেই আরেক ডিবেটার বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিনের সঙ্গে পরিচয় বুশরার। মারা যাওয়া বুয়েট ছাত্র ফারদিনের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকলেও প্রেম ছিল না বলে দাবি করেছেন বুশরার পরিবার।

বাবা মঞ্জুরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলেছি বুশরা নির্দোষ। এরপরও একটা মেয়ে হত্যা মামলায় আসামি হলো, জেলে গেল। পুরো পরিবার ট্রমায় ভুগছে। আমরা বুশরার সঙ্গে দেখা করেছি। বুশরাকে বিমর্ষ দেখেছি, ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। আমরা কোনও সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা পাইনি।

তিনি বলেন, আজ তদন্তকারীরাই জবাব দিয়েছে, তারাই বলেছে ফারদিন স্বেচ্ছায় মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যায় যেটাই হোক খুন হয়নি। মাঝখান থেকে আমার মেয়েটার জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেল। ক্যারিয়ারটা ধ্বংস হয়ে গেল। এখনো মেয়েটা জেল খাটছে।

তিনি বলেন, আমরা আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, ডিবি ও র‌্যাবের সঙ্গে কথা বলেছি। ঢাকা মহানগর আদালত এখন বন্ধ রয়েছে। খোলা মাত্র আমরা আর্জি করবো। ডিবি পুলিশও মামলা থেকে বুশরার নাম বাদ দেওয়ার কথা বলেছে।

যোগাযোগ করা হলে মতিঝিল গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) রাজিব আল মাসুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের কিছু ফাইন্ডিংস বাকি আছে। সেসব শেষ করে আদালতে আমরা ফারদিন হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিল করবো। ইতোমধ্যে ডিবি পুলিশ থেকে জানানো হয়েছে ফারদিন খুন হয়নি। স্বেচ্ছায় বা আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে গ্রেপ্তার বুশরা নির্দোষ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তার নাম বাদ দিয়ে দাখিল করা হবে। এরআগে বুশরার পরিবার আদালতে আর্জি করতে পারেন। আদালত যদি আমাদের এব্যাপারে কিছু জানতে চায় তা আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালতকে জানাবো।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর