শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৩০ অপরাহ্ন

ভোলায় প্রভাবশালীদের অবৈধ জালে নদী দখল

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২
image-291189-1663584863 (1)

ভোলার বোরহানউদ্দিনের মেঘনা নদীতে প্রায় ৩ কিলোমিটার জায়গায় ৪ টি খরছি জাল ও ৪টি অবৈধ পিটানিয়া জাল এবং তেঁতুলিয়া নদীতে খুঁটি জাল পেতে নদী দখল করে মাছ ধরার অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে সাধারণ জেলেরা ওই এলাকায় জাল ফেলতে না পারায় ওই জাল তাঁদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিন ইউনিয়নের জন প্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীরা নদী দখলের মূল হোতা বলে সাধারণ জেলেরা অভিযোগ করেন। তাঁরা ওই অবৈধ জালের মালিকদের দৌরাত্ন্য থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, এরকম চলতে থাকলে নদী মাছশূন্য হতে বেশি সময় লাগবেনা।

সরেজমিনে সাধারণ জেলেদের নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলেরা জানান, তজুমদ্দিন উপজেলার মলংচোরা ইউনিয়দের চেয়ারম্যান মো. নূরনবী শিকদার বাবুল, একই এলাকার মিশু হাওলাদার, বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড়মানিকা ইউনিয়নের আবু সায়েদ মাঝি, কালাম মাঝি, হাসান নগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মানিক হাওলাদার, ওই ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জাহাঙ্গির মাঝি সহ একটি প্রভাবশালী চক্র খরছি জাল ও পিটানিয়া জাল দিয়ে মেঘনার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দখলে নিয়ে জেলেদের দিয়ে মাছ শিকার করছে।

এছাড়া ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ডুবোচরে একাধিক জাল ফেলে বড় বড় বাঁশ দিয়ে ওই জালের ভিতর পানিতে আঘাত করতে করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে পিটিয়ে ধরা হয় ইলিশ মাছ। ছোট-বড় যা থাকে সবই আটকে যায় জালে।

এমনকি কীট-পতঙ্গও রক্ষা পায়না। এক পর্যায়ে জাল ছোট করে তার ভেতর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ তুলে আনা হয়। তারা জানান, মাছের আনাগোনা ভালো হলে একেকটি খ্যাও (জালে) দেড় থেকে ২ লাখ টাকার মাছ পাওয়া যায়।

সাধারণ জেলেদের ওই সকল স্থানে যাওয়া নিষেধ। তাঁরা জানান, প্রতিদিনই নদীতে জাল ফেলতে গিয়ে মেঘনার প্রবল স্রোতে তাঁদের জাল খরছি জালের খুঁটির সাথে জড়িয়ে যায়। এরপর ওই জাল আর খুলে আনা সম্ভব হয় না। এতে গত ২-৩ মাসে কয়েক লাখ টাকার জাল হারিয়ে শত শত জেলে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রভাবশালীদের লাঠিয়াল বাহিনীর ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। প্রশাসন মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান দিলেও এরা থাকেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

তেঁতুলিয়া নদীতেও প্রভাবশালীরা নদী দখল করে খুঁটি ও বেহুন্দি জাল পেতে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করছেন। পাশাপাশি সাধারণ মৎস্যজীবিদের তাঁর দখলকৃত এলাকায় মাছ ধরতে দিচ্ছেন না বলে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সাধারণ জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যেখানে এ অবৈধ জাল পুঁতে আমাদের নিঃস্ব করা হচ্ছে ওই স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যেই হাকিমউদ্দিন নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। নদীতে নৌ-পুলিশ নিয়মিত নদীতে টহল দিলেও ওই অবৈধ জালের ব্যাপারে তারা কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

জানতে চাইলে হাকিমুদ্দিন নৌ পুলিশ ফাঁরির ওসি শরিফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, নদীতে খুঁটি পুঁতা দেখেছেন, তবে তাঁরা কোন জাল দেখতে পাননি।

এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা নদীর বোরহানউদ্দিন উপজেলার সীমান্তবর্তী হাসাননগর এলাকার রবু’র চর হতে পশ্চিম দিকে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা দখল করে ৪টি খরছি জাল ও রবু’র চরের মাথা হতে নাগর পাটোয়ারী চর পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা দখল করে ৪টি পিটানিয়া জাল পেতে নদী দখল করে অবাধে সকল রকম ছোট বড় মাছ নিধন করছে প্রভাবশালী চক্র।

জানা যায়, নদীর মাঝে পুঁতে রাখা অবৈধ খুঁটির বেড়ার চারপাশে জাল বাঁধা থাকে, জোয়ারে নদী টই-টুম্বর হলে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা জাল ওপরে তুলে বেঁধে দেওয়া হয়। ভাটায় পানি কমলে বেড়ার মধ্যখানে জাল টেনে মাছের রেনু-পোনা সহ সকল প্রকার মাছ নৌকায় তুলে নেয়। অবৈধ জাল দিয়ে নদী দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান নগর সাবেক ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মানিক হাওলাদার জানান, এ ব্যাপারে জাহাঙ্গির মাঝির সাথে কথা বলেন। মলংচোরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. নূরনবী শিকদার বাবুল সংবাদিক পরিচয় পেয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন।

এ বিষয়ের প্রভাব জানতে চাইলে সরকারি আব্দুল জব্বার কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক সঞ্জীব কুমার সরকার জানান, সবকিছুর মত নদীরও প্রাকৃতিক ভারসাম্য আছে। আর এ ভারসাম্য আন্ত:সম্পর্কযুক্ত। এর ফলে নদীতে মাছের আকাল হবে।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তোতা মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এরকম হলে নদীর বাস্তু-সংস্থান সম্পূর্ন ভেঙে পড়বে। নদীতে মাছ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। আমাদের আমিষের বড় উৎস আর থাকবে না।

এছাড়া হুমকির মূখে পড়বে নদীর পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য। ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল হক জানান, এ অবৈধ জালের সাথে যতবড় প্রভাবশালী জড়িত থাকুক কেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা। তিনি আরোও জানান, খরছি ও পিটানিয়া জাল নদীতে ফেলা একেবারেই নিষিদ্ধ। খুব শীঘ্রই প্রশাসনকে সাথে নিয়ে এসকল অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর