January 18, 2022, 10:18 pm

ইউরোপে টিকাহীনদের বিরুদ্ধে চলছে যুদ্ধ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, নভেম্বর ২০, ২০২১
  • 49 বার পঠিত

ইউরোপে এখন ক্রিসমাসের উৎসব হওয়ার কথা ছিল, যেখানে পরিবার এবং বন্ধুরা আবার ছুটিতে আনন্দে মেতে উঠবে এবং একে অপরকে আলিঙ্গন করতে পারবে। কিন্তু তার পরিবর্তে মহাদেশটি কোভিড-১৯ মহামারীর বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে। রেকর্ড মাত্রায় বেড়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ।

প্রায় দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংক্রমণ আবার বেড়ে চলায় যে স্বাস্থ্য সঙ্কট তৈরি হয়েছে তা এক নাগরিকের বিরুদ্ধে অপর নাগরিককে উস্কে দিচ্ছে, টিকাহীনদের বিরুদ্ধে টিকা নেওয়া লোকদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থেকে রক্ষা করতে মরিয়া সরকারগুলো এমন নিয়ম আরোপ করছে যা টিকাহীনদের পছন্দকে সীমিত করছে, এই আশায় যে এর ফলে হয়তো টিকা দেওয়ার হার বেড়ে যাবে।

শুক্রবার অস্ট্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে।

অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর আলেকজান্ডার শ্যালেনবার্গ বলেছেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আমি এবং অন্যরা ভেবেছিলাম যে, অস্ট্রিয়ার লোকদের স্বেচ্ছায় টিকা নেওয়ার জন্য বোঝানো সম্ভব হবে। কিন্তু তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে’।

টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করার এই পদক্ষেপকে তিনি ‘ভাইরাল তরঙ্গ এবং লকডাউনের দুষ্ট চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায়’ বলেছেন।

টিকা বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে অস্ট্রিয়া এখনও পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে আরও কিছু দেশের সরকার এই বিষয়ে কঠোর হচ্ছে।

সোমবার থেকে স্লোভাকিয়া সমস্ত অপ্রয়োজনীয় দোকান এবং শপিং মলে ভ্যাকসিন নেয়নি এমন লোকদের নিষিদ্ধ করছে। তাদের কোনো পাবলিক ইভেন্ট বা সমাবেশে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না এবং শুধুমাত্র কাজে যাওয়ার জন্য সপ্তাহে দুবার করোনা টেস্ট করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী এডুয়ার্ড হেগার সতর্ক করে বলেছেন, ‘একটি আনন্দময় বড়দিন মানে কোভিড-১৯ ছাড়া বড়দিন নয়। এই উৎসব ঘটানোর জন্য, স্লোভাকিয়ার আরও অনেক বেশি টিকা দেওয়ার হার থাকতে হবে’।

তিনি এই ব্যবস্থাগুলোকে ‘টিকাহীনদের জন্য একটি লকডাউন’ বলে অভিহিত করেছেন।

স্লোভাকিয়ার ৫৫ লাখ জনসংখ্যার মাত্র ৪৫.৩% সম্পূর্ণরূপে টিকা নিয়েছে। মঙ্গলবার দেশটিতে রেকর্ড ৮৩৪২ জনের দেহে করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছে।

শুধু মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোই নয় বরং পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলোতেও নতুন করে আঘাত হেনেছে করোনা। যার ফলে সেই দেশগুলোও তাদের জনসংখ্যার উপর আবার বিধিনিষেধ আরোপ করছে।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘এটি সত্যিই, একেবারে, পদক্ষেপ নেওয়ার সময়’। জার্মানির ৬৭.৫% মানুষ টিকা নিয়েছে। তবে এবার অনেক স্বাস্থ্য পেশাদারদের জন্যও টিকা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

গ্রীসও টিকাহীনদের টার্গেট করছে। প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস বৃহস্পতিবার টিকাহীনদের জন্য নতুন বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছেন। তাদেরকে বার, রেস্তোরাঁ, সিনেমা, থিয়েটার, যাদুঘর এবং জিম সহ গণ স্থানগুলোতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এমনকি তারা কোভিড নেগেটিভ হলেও।

মিৎসোটাকিস বলেন, ‘সুরক্ষার জন্য এটি একটি তাত্ক্ষণিক কাজ এবং অবশ্যই এর ফলে লোকে টিকা নিতে উৎসাহিত হবে’।

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ইইউ’র একজন আইরিশ আইন প্রণেতা এবং ইউরোপীয় সংসদের নাগরিক স্বাধীনতা ও বিচার কমিটির সদস্য ক্লেয়ার ডেলিকে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি বলেন যে, ব্যক্তি অধিকারকে পদদলিত করা হচ্ছে।

ডেলি বলেন, ‘ইইউর সদস্য রাষ্ট্রগুলো মানুষের কর্মস্থলে যাওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে’। ডেলি শুক্রবার সম্পূর্ণ লকডাউন আরোপ করার সিদ্ধান্তের আগে টিকাহীনদের ওপর অস্ট্রিয়ার বিধিনিষেধকে ‘একটি ভীতিকর পরিস্থিতি’ বলে অভিহিত করেছেন।

এমনকি আয়ারল্যান্ডে, যেখানে জনসংখ্যার ৭৭.৯% সম্পূর্ণরূপে টিকা নিয়েছে সেখানেও যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেসবের বিরুদ্ধেও তিনি একটি প্রতিক্রিয়া অনুভব করেন।

তিনি বলেন, ‘সেখানেও যারা টিকা নেয়নি তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য দিয়ে চাবুক মারা হচ্ছে’।

বিশ্বের অনেক দেশে গুটিবসন্ত এবং পোলিওর মতো রোগের জন্য বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিনের ইতিহাস রয়েছে। অথচ, বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মৃতের সংখ্যা ৫ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, ভ্যাকসিনগুলো কোভিড-১৯ থেকে মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুরক্ষা দেয় এবং মহামারীর বিস্তারকে ধীর করে দেয় এ ব্যাপারে স্পষ্ট চিকিৎসা প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশের মধ্যে টিকা নেওয়ায় অনীহা একগুঁয়েভাবে শক্তিশালী রয়ে গেছে।

প্রায় ১ লাখ মানুষ, ‘স্বাধীনতা, স্বাধীনতা’ স্লোগান দিতে দিতে এই সপ্তাহে প্রাগে জড়ো হয়েছিল চেক সরকারের বিধিনিষেধের প্রতিবাদ করতে।

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের প্রফেসর পল ডি গ্রাউই বলেন, ‘কোনও একক ব্যক্তি স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। অন্যদের সুস্বাস্থ্য উপভোগ করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য টিকা না নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত হওয়া দরকার’। তিনি উদারপন্থী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক লিবারেলসে এক নিবন্ধে একথা লিখেছেন।

এই নীতি এখন বন্ধুদের একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে পরিবারগুলোকে বিভক্ত করছে।

লিউভেন ইউনিভার্সিটির একজন সাধারণ অনুশীলনকারী এবং অধ্যাপক ব্রিজিট্টে শোয়েনমেকার প্রায় প্রতিদিনই এটি দেখেন।

তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের মধ্যে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে’।

ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং তীব্র মানবিক গল্পকেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব উস্কে দিতে দেখেছেন তিনি। তার একজন রোগীকে তার বাবা-মায়ের বাড়ির বাইরে তালা মেরে দেওয়া হয়েছে, কারণ তিনি টিকা দিতে ভয় পান।

শোয়েনমেকার বলেন, কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে বাধ্যতামূলক টিকা দেওয়ার ধারণার প্রতি আপত্তি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু অত্যন্ত সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আসার পর মত বদলেছে তারা।

তিনি বলেন, ‘এত বড় একটি ইউ-টার্ন নেওয়া অবিশ্বাস্যভাবে কঠিন’।

করোনার বিধিনিষেধের প্রতিবাদে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে নেদারল্যান্ডসের রোটাডাম শহরের রাস্তা। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে সেখানে জড়ো হন হাজারো বিক্ষোভকারী। ব্যাপক অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জানান দেন নতুন আরোপিত বিধিনিষেধ মানতে নারাজ তারা। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এসময় দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও জলকামান নিক্ষেপ করে। এতে আহত হন অনেকে। তবে মোট কতজন আহত হয়েছেন তা এখনও জানা যায়নি।

প্রতিবাদে পুলিশের গাড়ি ভাংচুরসহ আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। এসময় পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও বিস্ফোরক পটকা নিক্ষেপ করেন তারা। বিক্ষোভকারীদের চাপে শহরের সাথে রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

দেশটিতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ায় তিন সপ্তাহের জন্য লকডাউন ও বিধিনিষেধ আরোপ করে ডাচ সরকার। করোনা সনদ পাস বাধ্যতামূলক করার আইনও জারির করে সরকার। একইসাথে নববর্ষে আতশবাজী নিষিদ্ধ করা হয়। এমন সিদ্ধান্তে বিরোধিতা করে আসছিল দেশটির মানুষ।

কর্মক্ষেত্রে করোনা টিকা বাধ্যতামূলক করার প্রতিবাদে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। শুক্রবার মেলবোর্ন, সিডনি, অ্যাডিলেড ও ব্রিসবেনে বিক্ষোভ করেন তারা। এতে, অন্তত ১০ হাজার বিক্ষোভকারী অংশগ্রহণ করেন। এসময় তারা ব্যানার ও প্লেকার্ড হাতে সরকার প্রণীত মহামারীর আইন প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।

0Shares

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর