বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের চেংগুটিয়া গ্রামে করোনাকালের দুর্যোগময় সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ শুরু করেন সৈয়দ মাজারুল ইসলাম রুবেল। স্কুলজীবন থেকেই স্কাউটিং ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত মাজারুলের নেতৃত্বে ২০২০ সালে স্থানীয় যুবসমাজ মানবিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৩ সাল থেকে ‘একঝাঁক মানবিক মানুষ’ নামে সংগঠিতভাবে কাজ শুরু হয়। বর্তমানে কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠনটির সঙ্গে কাজ করছেন।
করোনাকালে মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিতরণ এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের পরিধি ধীরে ধীরে বেড়েছে। সংগঠনটির দাবি, মানুষের আর্থিক সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাশ্রমে চেংগুটিয়া গ্রামের ১১টি গৃহহীন পরিবারের জন্য নতুন ঘর নির্মাণ করে গ্রামটিকে গৃহহীনমুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গৌরনদী উপজেলার পশ্চিম সমাদ্দারপাড় গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া তিনটি কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতা, অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা, একজন বেকার যুবককে ভ্যান কিনে দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হুইলচেয়ার বিতরণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, গ্রামীণ রাস্তা মেরামত, উন্মুক্ত পাঠাগার স্থাপন, চেংগুটিয়া বাজারের ঈদগাহ নির্মাণে সহযোগিতা, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য রোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেছে সংগঠনটি।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বেচ্ছাসেবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কেউ সহায়তাপ্রয়োজন এমন পরিবার চিহ্নিত করেন, কেউ অর্থ সংগ্রহে সহযোগিতা করেন, আবার কেউ মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালনা ও উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেন। স্বেচ্ছাসেবী সাইদুল ইসলাম, আনিচ তালুকদার, রফিকুল ইসলাম ও ইলিয়াছ হাওলাদার বলেন, “কোনো একটি কাজ শেষ হলেই মাজারুল প্রায়ই বলেন, আর কোনো কাজ করবেন না। কিন্তু কোনো অসহায় মানুষ সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এলে তিনি আবার উদ্যোগ নেন। তখন আমরাও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।”
সংগঠনের আরেক স্বেচ্ছাসেবী আহাদ তালুকদার বলেন, “মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যে বাস্তব শিক্ষা পাওয়া যায়, মাজারুল ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে তা উপলব্ধি করেছি। মানুষের জন্য কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।”
মানবসেবার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও সক্রিয় মাজারুল। গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া এলাকার টরকী–বাসাইল খাল দখলমুক্ত করা ও পুনঃখননের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছেন তিনি। বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য রোধেও কাজ করছেন সংগঠনের সদস্যরা। মাজারুল বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সহযোগী সংগঠন ‘সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’র বরিশাল জেলা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক। পাশাপাশি তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ’-এর সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়াই মানুষের আর্থিক সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ৪০ লক্ষাধিক টাকার মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। মাজারুল বলেন, “যেকোনো কাজ শুরু করার আগে আমরা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে সাধারণ সভা করি। ব্যয়ের বাজেট নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করি। বাজেট অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ হয়ে গেলে ক্যাম্পেইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থের ঘাটতি থাকলে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের পকেট থেকে তা পূরণ করেন। আমরা কাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। আমাদের কার্যক্রমে আগৈলঝাড়া উপজেলা প্রশাসনও সবসময় সহযোগিতা করেছে।”
সংগঠনটির সহায়তায় ঘর ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া রিপন হাওলাদার বলেন, “আমার মা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকার মতো কোনো ছাউনি ছিল না। তাঁরা আমাদের ঘর করে দিয়েছেন, এই ঋণ কোনোদিন শোধ করার মতো নয়।”
আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, “‘একঝাঁক মানবিক মানুষ’ সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে আমি অবগত। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে তারা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তা প্রশংসনীয়। এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ প্রশাসনের কাজকেও অনেক সহজ করে দেয়।”
ধানডোবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এইচএম মানিক হাসান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর সিদ্দিকও মাজারুলের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “মুক্তিসংগ্রামের চেতনা ছিল মানুষের কল্যাণ করা। তরুণ বয়সে যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলাম, মাজারুলের কাজের মধ্যে আমি সেই দেশের সেবার দীপ্তি খুঁজে পাই।”
নিজের কাজের লক্ষ্য সম্পর্কে মাজারুল বলেন, “আমি শুধু আমার কাজটুকু করে যেতে চাই। আমাদের একটাই চাওয়া—সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি। আমরা শূন্য হাতে মাঠে নামি, আর দিনশেষে মানুষের মুখের একটু হাসি দেখে ঘরে ফিরি। আমাদের দেশ ছোট, সম্পদ সীমিত। সরকারের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষের পাশে দাঁড়াই, তবে সমাজটা অনেক সুন্দর হতে বাধ্য।”
‘একঝাঁক মানবিক মানুষ’-এর কার্যক্রমে উঠে এসেছে সম্মিলিত উদ্যোগের শক্তি। মাজারুলের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবীদের সময়, শ্রম ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় অসহায় পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষায় নানা কাজ পরিচালিত হচ্ছে। চেংগুটিয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন